ডাকসুর ভিপি থেকে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের ফিনিক্স পাখি হয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। 

সোমবার (১ জুন) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি সর্বশেষ ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী আনোয়ার বেগম এবং একমাত্র সন্তান ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধা রেখে গেছেন।

তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মৌলভী আজহার আলী এবং মায়ের নাম ফাতেমা বেগম।

তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাসের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন।

ছাত্রলীগের মাধ্যমে তোফায়েল আহমেদের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তিনি ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তার নেতৃত্বেই ঊনসত্তরের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল ছাত্র গণসংবর্ধনায় শেখ মুজিবকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তোফায়েল আহমেদ।

১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রথমবারের মতো জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অন্যতম গেরিলা বাহিনী ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিজের জেলা ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তোফায়েল আহমেদ ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে তিনি সফলভাবে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান।

রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় এই বর্ষীয়ান নেতাকে অসংখ্যবার কারাবরণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর তিনি টানা ৩৩ মাস কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।