‘পেটের দায়ে এই জানমারা গরমেও রিকশা নিয়ে বাহির হতে হয়’

রাজশাহী মহানগরীর এক রিকশাচালক জীবিকার প্রয়োজনে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও রিকশা চালাতে হচ্ছে বলে হতাশা প্রকাশ করেন।  

অলোকার মোড় এলাকার রিকশাচালক রহমত মিয়া (৪৫) বলেন, “রাস্তার পিচ থেকে মনে হয় আগুনের ভাপ উঠছে, রিকশার সিটে বসা যায় না। একটু পর পর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। কিন্তু পেটের দায়ে এই জানমারা গরমেও রিকশা নিয়ে বাহির হতে হয়।”

ট্রাফিক কনস্টেবল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “মাথার ওপর চড়া রোদ আর চারপাশের গাড়ির গরম ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় দম আটকে আসে। ডিউটি তো করতেই হবে, তাই পকেটে স্যালাইনের পানি রেখে একটু পর পর খেয়ে শরীরটা কোনোমতে টিকিয়ে রাখছি।”

রাজশাহীতে গেল কয়েকদিন ধরে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছিল। এবার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে মাঝারিতে রূপ নিয়েছে। তাপদাহে মানুষ, প্রাণি, ফসল ও প্রকৃতি; সবকিছুই যেন এক নির্মম দহনে ক্লান্ত। অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে প্রকৃত চেয়ে অনুভূত তাপমাত্রা অনেক বেশি মনে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর আগের দিন বুধবার (৩ জুন) রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এর আগে মঙ্গলবার (২ জুন) ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সোমবার (১ জুন) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রবিবার (৩১ মে) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৪০ থেকে ৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে সেটিকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পিচগলা রাস্তায় একটু স্বস্তির খোঁজে পথচারিরা ভিড় করছেন আখের রসের দোকানে। শীতল এক গ্লাস আখের রস জুড়িয়ে নিচ্ছেন প্রাণ। তীব্র গরমে তৃষ্ণা মেটাতে সাধারণ মানুষ ডাবও খাচ্ছেন। তবে চাহিদার সুযোগ নিয়ে বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারা।

দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেও রাতের রাজশাহীতে স্বস্তির কোনো লক্ষণ নেই। আবহাওয়ার সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, রাতের আকাশ প্রধানত পরিষ্কার থাকলেও ভ্যাপসা গরম কাটছে না। রাতে তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হলেও বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে শরীরে তা প্রায় ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো অনুভূত হচ্ছে।

মধ্যরাতের দিকে তাপমাত্রা সামান্য কমে ২৯ থেকে ২৮ ডিগ্রিতে নামলেও আর্দ্রতা প্রায় ৮৩% পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে, যা গরমের অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এদিকে, প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। বাজার, সড়ক ও জনসমাগমস্থলগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি কম। তবে জীবিকার তাগিদে যাদের বাইরে থাকতে হচ্ছে, তাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, নির্মাণ শ্রমিক, খেতমজুর ও দিনমজুরদের কাজ করতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। প্রচণ্ড রোদে কিছুক্ষণ কাজ করলেই শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। বারবার পানি পান করেও তৃষ্ণা মিটছে না। বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, শ্রমজীবী মানুষরা গাছের ছায়া কিংবা দোকানের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করছেন। অনেকেই বলছেন, দুপুরের দিকে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, “টানা কয়েকদিন তাপদাহ যাচ্ছে। তবে তাপমাত্রা কমে আসবে। এর মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।”