জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণে নিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ শুরু

চট্টগ্রামের আলোচিত ও অপরাধপ্রবণ জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দুর্গম ও আইন-শৃঙ্খলা সংকটে থাকা এই অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদারের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে চারটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (৮ জুন) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীনে ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (ইসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্মাণকাজের উদ্বোধন করে।

কাজের উদ্বোধন উপলক্ষে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকার পূর্ব পাশের পাহাড়ি অঞ্চলে নির্মাণাধীন সড়ক পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ২৬ ইসিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ, পিএসসি।

তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে ছিন্নমূল এলাকা থেকে আলীনগর উচ্চবিদ্যালয় পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মাণ করা হবে। এছাড়া যোগাযোগের পরিধি বাড়াতে আরও তিনটি সড়কের পরিকল্পনা রয়েছে: আলীনগর থেকে টেক্সটাইল এলাকা হয়ে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত সংযোগ সড়ক। আলীনগর থেকে বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমির (বিএমএ) পাশ দিয়ে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্তকারী সড়ক। জঙ্গল সলিমপুরের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক ও সাধারণ যাতায়াতের জন্য আরও একটি অভ্যন্তরীণ সড়ক।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ বলেন, “এই প্রকল্পের জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট বাজেট অনুমোদন হয়নি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হয়েছে। দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় সড়ক নির্মাণে সেনাবাহিনীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা দ্রুত কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।”

সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম দুর্গম এবং সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। পাহাড় ও বনাঞ্চলবেষ্টিত এই জনপদে কয়েক দশক ধরে অবৈধ পাহাড় কাটা, সরকারি খাসজমি দখল এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগ রয়েছে। নব্বইয়ের দশকে আলী আক্কাস নামে এক ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ খাসজমি দখল করে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে এখানে নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। পরে ‘ছিন্নমূল পুনর্বাসন’ প্রকল্পের নামে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে প্লট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ ভূমি বাণিজ্য শুরু হয়।

দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা এই অঞ্চলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে এক বিশেষ অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় র‍্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন।

এই নৃশংস ঘটনার পর গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের প্রায় চার হাজার সদস্যের সমন্বয়ে সেখানে একটি নজিরবিহীন যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় যৌথবাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

যৌথবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের পরও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। গত ২৪ মে গভীর রাতে জঙ্গল সলিমপুরে স্থাপিত যৌথবাহিনীর একটি ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালায় দুর্ধর্ষ দুর্বৃত্তরা। এ সময় পুলিশ ও র‍্যাবের পাল্টা গুলিতে হামলাকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে হামলার আগে তারা নির্মাণাধীন একটি নিরাপত্তা ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অগ্রযাত্রা ও গাড়ি চলাচল ব্যাহত করতে প্রধান একটি সড়ক কেটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, অপরাধীদের সড়ক কেটে দেওয়ার অপচেষ্টার জবাবে সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক নির্মাণ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। সড়কগুলো তৈরি সম্পন্ন হলে জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন হবে এবং অবরুদ্ধ থাকা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।