টঙ্গীর শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের পরিত্যক্ত ভবনে মাদক-জুয়ার আড্ডা

শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত টঙ্গীর শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রটি বর্তমানে অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে কামারপাড়া রোডের মাথায় অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি স্থাপনাটি একসময় শ্রমিক কল্যাণের অন্যতম ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর একটি বড় অংশ জরাজীর্ণ, অব্যবহৃত এবং কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। শ্রম অধিদপ্তরের অধীন শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনগুলোর দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও কোথাও জানালার কাচ ভাঙা ও ক্ষতিগ্রস্ত। ভবনের চারপাশে বেড়ে ওঠা ঝোপঝাড়, আগাছা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ পুরো এলাকাকে আরও বেশি নির্জন ও অরক্ষিত করে তুলেছে। দিনের বেলায় কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সন্ধ্যার পর পুরো এলাকার পরিবেশ বদলে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, শিশুস্বাস্থ্য এবং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকা ভবনে সন্ধ্যার পর সন্দেহজনক ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ছে। তারা অভিযোগ করেন, পরিত্যক্ত ভবনে মাদকসেবন, জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজ চলে। সংঘটিত হয় অপরাধ। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, এখানে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শ, আয়রন ট্যাবলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এছাড়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রতিবছর সাধারণত ৮ থেকে ১০টি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। পাঁচ দিনব্যাপী এসব প্রশিক্ষণে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক কল্যাণবিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে এসব প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সংস্কারের অভাবে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই প্রতিষ্ঠানটি এখন ভাড়ায় টঙ্গীর অলিম্পিয়া রোড এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানের জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা আসমা আক্তার এবং সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস আক্তারসহ মোট ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন। অনুমোদিত জনবল ১৩ জন হলেও বর্তমানে দুটি পদ শূন্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পাঞ্চলের বিপুল শ্রমিক জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই জনবল অত্যন্ত সীমিত। ফলে সেবার পরিধি বৃদ্ধি এবং কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।

প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। নিরাপত্তা প্রহরী নেই বললেই চলে। দীর্ঘদিন ধরে ভবনের বিভিন্ন অংশ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অসাধু চক্রের দখলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। রাতের বেলায় অনেক অপরিচিত ব্যক্তিকে পরিত্যক্ত ভবনের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন অব্যবহৃত ভবনগুলো সংস্কার করে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট, শ্রমিক সহায়তা কেন্দ্র অথবা বহুমুখী সামাজিক কল্যাণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরাও সরাসরি উপকৃত হবেন। নিরাপত্তা জোরদার, সীমানা প্রাচীর সংস্কার, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পরিত্যক্ত অংশগুলো পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

টঙ্গী শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্রের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস আক্তার বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সংস্কার এবং সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়সহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েছি। ভবনের সংস্কার, নিরাপত্তা জোরদার এবং সেবার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়ে একাধিকবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে। আমরা আশাবাদী, দ্রুত বরাদ্দ পেলে শ্রমিকদের জন্য আরও উন্নত ও আধুনিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (সিনিয়র যুগ্মসচিব) সাহা আব্দুল তারেক বলেন, “টঙ্গী শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়টি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব ও কারিগরি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শ্রমিক কল্যাণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।”