সন্দেহভাজন ধর্ষণ ও হত্যাকারী আসামিকে উদ্ধারে গিয়ে এসপি, ওসিসহ আহত ২০

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নিখোঁজ এক শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা। শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে এক সন্দেহভাজন যুবককে গণপিটুনি থেকে বাঁচাতে গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রশাসনকে। এতে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) ও আদিতমারী থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) গাড়িসহ প্রশাসনের অন্তত সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এই নজিরবিহীন সংঘর্ষ ও অবরুদ্ধের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে পুলিশ দুজনকে আটক করেছে। তারা হলেন, ফলিমারী গ্রামের রণজিৎ কুমার এবং তার ছেলে প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র রায় (২২)। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে আজ মঙ্গলবার সকালে ফলিমারী গ্রামের একটি ভুট্টা ক্ষেত থেকে সাত বছর বয়সী এক শিশুর বস্তাবন্দি ও মাটিচাপা দেওয়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত শিশুটি স্থানীয় একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

পরিবারের অভিযোগ, শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। স্বজনরা জানান, সোমবার বিকেল থেকে শিশুটি নিখোঁজ ছিল। অনেক খুঁজেও তার সন্ধান মেলেনি। আজ সকালে বাড়ির পাশের ভুট্টা ক্ষেতে সদ্য খুঁড়ে রাখা নরম মাটি দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে ওই মাটি খুঁড়ে শিশুটির বস্তাবন্দি মরদেহ পাওয়া যায়।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, সোমবার সন্ধ্যায় একই গ্রামের মাদকাসক্ত যুবক বিধান চন্দ্র রায়কে ওই ভুট্টা ক্ষেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখেছিলেন এক প্রতিবেশী। শিশুটির লাশ পাওয়ার পর এই সন্দেহের জেরে দুপুরে এলাকাবাসী বিধানের বাড়িতে চড়াও হয়।

এলাকাবাসীর দাবি, বিধান শিশুটিকে ফুসলিয়ে ভুট্টা ক্ষেতে নিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দেয়। গণপিটুনি এড়াতে বিধান নিজের ঘরে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ভেতরে আত্মগোপন করেছিলেন। বিক্ষুব্ধ জনতা ঘরের তালা ভেঙে তাকে বের করে পিটুনি দেওয়ার চেষ্টা করে। খবর পেয়ে আদিতমারী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিধানকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। কিন্তু উত্তেজিত জনতা তাকে পুলিশ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়ার দাবি জানালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

পুলিশ আসামিকে জনতার হাতে ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালে পুরো গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জনতা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। খবর পেয়ে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম এবং পুলিশের ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ পুরো টিমকেই অবরুদ্ধ করে ফেলে।

প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর পুলিশ অভিযুক্ত বিধান ও তার বাবাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় তাদের লক্ষ্য করে চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ইটের আঘাতে এসপি আসাদুজ্জামান, আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ প্রশাসনের অন্তত ২০ জন আহত হন। ভাঙচুর করা হয় জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ সরকারি সাতটি যানবাহন।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, “জনতার ছোড়া ইটের আঘাতে আমি নিজেও আহত হয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের তিনটি সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আদিতমারী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিশু হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং মূল অভিযুক্তসহ দুইজনকে আটক করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পৃথক আরেকটি মামলার প্রস্তুতি চলছে।”

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক বলেন, ‍“নৃশংস এই শিশু হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। তবে আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আপাতত থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”