জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) আব্দুর রশিদ জিতু এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলামের নিয়মিত শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর তাদের পদে বহাল থাকা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিধি, অধ্যাদেশ ও জাকসুর গঠনতন্ত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তাদের ছাত্রত্বের অবস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় পদ ও সিনেট সদস্যপদের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রি অর্ডিন্যান্সের ৬.১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণে ব্যর্থ হলে বা উত্তীর্ণ না হলে তিনি আর নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন না। যদিও বিভাগীয় সভাপতির অনুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে একবার অনিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে, তবে নিয়মিত ছাত্রত্ব বহাল থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেজা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাতদিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছাড়তে হয়। এরপর তারা আর নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে গণ্য হন না। প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি ও বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবেদা সুলতানাও একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্রত্ব শেষ হলে সিনেট সদস্যপদ বাতিলের কথা বলা আছে। তবে জাকসুর গঠনতন্ত্রে ছাত্রত্ব শেষ হলে ভিপি-জিএসের পদ শূন্য হবে—এমন স্পষ্ট বিধান নেই। এ জায়গায় জাকসুরর গঠনতন্ত্র স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।
ভিপি-জিএসের নিয়মিত শিক্ষাজীবন শেষ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি নিয়মিত মাস্টার্স ২০২২ পরীক্ষায় একটি কোর্সে অকৃতকার্য হন। জাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নিয়মিত মাস্টার্সে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বৈধ ভোটার হিসেবে গণ্য হন। তবে নিয়মিত মাস্টার্স ২০২৩ (৪৮তম ব্যাচ) পরীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সে হিসেবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার ছাত্রত্বের বৈধতা শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শামীমা সুলতানা বলেন, “তার ব্যাচের নিয়মিত মাস্টার্স ২০২৩ পরীক্ষা শেষ হয়েছে। জিতু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি কোর্সের পরীক্ষায় অংশ নেননি। তাকে বিধি অনুযায়ী বিশেষ পরীক্ষা দিতে হবে।”
তবে জিতুর দাবি, জাকসুর গঠনতন্ত্রে ছাত্রত্ব শেষ হলে পদ ছাড়তে হবে—এমন কোনো স্পষ্ট বিধান নেই। তিনি বলেন, “আমি নিয়মিত শিক্ষার্থী না হলেও অনিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে এখনও শিক্ষাজীবনের সঙ্গে যুক্ত আছি। গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু না থাকায় পদে থাকা নিয়ে কোনো সমস্যা দেখি না।”
অন্যদিকে, জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম ইংরেজি বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনিও এক বছর ড্রপ দেওয়ার পর গত মে মাসে ৪৯তম ব্যাচের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। এর মাধ্যমে তারও একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
ইংরেজি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রায়হান শরীফ বলেন, “মাজহারের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “জাকসুর সদস্য হওয়ার নীতিমালা সুস্পষ্ট থাকলেও নিয়মিত শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর পদত্যাগ করতে হবে কিনা, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই।”
সিনেট সদস্যপদ নিয়েও জটিলতা
জাকসুর মনোনীত পাঁচ সিনেট প্রতিনিধির মধ্যে ভিপি ও জিএস—দুই শীর্ষ নেতার ছাত্রত্ব নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এর ১৯(২) ধারায় বলা হয়েছে, নিয়মিত ছাত্রত্ব শেষ হয়ে থাকলে তারা শুধু জাকসুর পদেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবেও বৈধতা হারাতে পারেন। ফলে তাদের পরিবর্তে নতুন ছাত্র প্রতিনিধি মনোনয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ বিষয়ে তারা জানান, গঠনতন্ত্রে ছাত্রত্ব শেষ হলে পদে থাকার বিষয়ে কোনো বিধান নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্রত্বের শর্ত রয়েছে। আমরা ছাত্রত্ব থাকাবস্থায় সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং সে অনুযায়ী চিঠিও পেয়েছি। এখন যেহেতু ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে, প্রশাসন বিষয়টি কীভাবে সমাধান করে তা দেখতে হবে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যাখ্যা দিতে পারবে।
এদিকে জাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো কারণে ভিপি ও জিএসের পদ শূন্য হলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত ভিপি ও ভারপ্রাপ্ত জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন অন্য সদস্যরা। ফলে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে জাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং সিনেটে তাদের প্রতিনিধিত্বের বৈধতা।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “এ বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মতামত চাওয়া হয়েছে। তাদের পরামর্শ পাওয়ার পর আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”