ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বিশেষ বরাদ্দের মালামাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দে কেনা বাইসাইকেল, ছাগল, স্প্রে মেশিন, সেলাই মেশিন, ফুটবল ও হুইল চেয়ার বিএনপি ও জামায়াত নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এক মাদ্রাসা ছাত্রের নামে বরাদ্দকৃত বাইসাইকেল নিজে সই করে তুলে নিয়েছেন। সেই বাইসাইকেল তিনি নিজের নাতিকে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী সরকার এসব অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বিষয় টি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য (ঝিনাইদহ-৩) মতিয়ার রহমানের নির্দেশে বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে বাইসাইকেলটি কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ফেরত দিতে বাধ্য হন ওই জামায়াত নেতা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোটচাঁদপুর কামিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাইমুন ইসলামের নামের একটি বাইসাইকেল বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু সাইমুনকে সেই সাইকেল না দিয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম নিজেই মাস্টাররোল পত্রে সই করে সাইকেলটি তুলে নেন। পরে সাইকেলটি তিনি তার মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
ভুক্তভোগী মাদরাসাছাত্র সাইমুন ইসলাম জানায়়, তার নামে বরাদ্দ হওয়া সাইকেলটি প্রথমে তাকে দেওয়া হয়নি। তার জন্মনিবন্ধনপত্র দিয়ে জামায়াত নেতা তাজুল ইসলাম বাইসাইকেলের বরাদ্দ নেন। তবে বিষয়টি জানাজানি হলে বুধবার তড়িঘড়ি করে বাইসাইকেলটি তার বাড়িতে পৌঁছে দেন জামায়াত নেতা।
এদিকে এডিপির আওতায় বরাদ্দকৃত এসব বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন ও স্প্রে মেশিন জামায়াত নেতার পাশাপাশি বিএনপির নেতারাও নিজেদের স্বজনদের মাঝে বণ্টন করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত নেতা মাওলানা তাজুল ইসলাম বলেন, “সাইকেলটি আমার প্রতিবেশী এক ছেলেকে দেওয়া হয়েছিল।”
যাকে বাইসাইকেল দেওয়া হয়েছে তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার মেজো ছেলে বেকার। আর্থিক সংকটে থাকায় সাইকেলটি তার মেয়েকে দিয়েছি। মারিয়া নামে মেয়েটি আমার পুতনি।”
তিনি আরও বলেন, “এসব নিয়ে কী হচ্ছে? বিএনপি-জামায়াতের লোকজন এসব মালামাল ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। তা এ নিয়ে আবার কী হচ্ছে?”
জানতে চাইলে কোটচাঁদপুর উপজেলা বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন বুলবুল সিডল বলেন, “এমন ঘটনার খবর পেয়েছি। যদি এ ধরনের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে তা দুঃখজনক। সরকারি বরাদ্দ যদি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এভাবে ভাগাভাগি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে এর পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।”
মাওলানা তাজুল ইসলামের এই কর্মকান্ডের ক্ষোভ প্রকাশ করেন কোটচাঁদপুর কামিল মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপাল ও সাবেক জামায়াত নেতা শের আলী।
তিনি বলেন, “মাওলানা তাজুল ইসলাম মোটেও কোনো দরিদ্র মানুষ নন। তিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। শহরে তার নিজস্ব বাড়ি আছে। সন্তানরাও ভালো চাকরি করেন। দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত বাইসাইকেল কৌশলে নিজের স্বজনকে দেওয়ার ঘটনা একজন দায়িত্বশীল মানুষের পক্ষে নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি।”
কোটচাঁদপুর ইউএনও দীপা রানী সরকার বলেন, “সাইকেল বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছিল। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে সাইকেলটি ফেরত আনা হয়েছে। এটি নতুন করে প্রকৃত উপকারভোগীর মাঝে বিতরণ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বাইসাইকেল ছাড়াও সেলাই মেশিন, ছাগল, স্প্রে মেশিন বিতরণেও কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”