১৪ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা, ৫৫ বছর পরও মেলেনি রাষ্ট্রীয় পরিচয়

ফুটো টিনের ছাউনি, চারপাশে জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ে ঘেরা একটি ছোট্ট ভাড়া ঘর। মাসে হাজার ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে সেখানেই একা বসবাস করেন ৬৯ বছর বয়সী বুলবুলী রানী ঘোষ, যিনি সবার কাছে বুলী ঘোষ নামে পরিচিত। অন্যের বাড়িতে কাজ আর বয়স্ক ভাতার সামান্য টাকায় কোনোরকমে জীবন চলে তার। তবে অভাব-অনটনের চেয়েও বড় কষ্ট, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েও আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাওয়া।

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা কুণ্ডুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বুলী ঘোষ জানান, ১৯৭১ সালের ১৪ মে ডেমরা এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ থেকে ১৫ বছর। সে সময় তাকে ধরে নিয়ে একটি ক্যাম্পে আটকে রাখা হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। স্বাধীনতার পর বাড়ি ফিরলেও তার জীবনের সংগ্রাম শেষ হয়নি।

সামাজিক লজ্জা, ভয় অপমানের আশঙ্কায় পরিবার দীর্ঘদিন ঘটনাটি গোপন রাখে। পরে তার বিয়ে হলেও অতীতের ঘটনা জানাজানি হলে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর আর নতুন করে সংসার গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ জীবনের অধিকাংশ সময়ই তাকে কাটাতে হয়েছে একাকিত্ব আর অবহেলার মধ্যে।

চোখের জল মুছতে মুছতে বুলী ঘোষ বলেন, একসময় তিনি জানতেনই না যে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের রাষ্ট্র বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরে বিষয়টি জানতে পেরে প্রয়োজনীয় আবেদন করেন। বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার একটাই প্রত্যাশা মৃত্যুর আগে রাষ্ট্র যেন তাকে তার প্রাপ্য পরিচয় মর্যাদা দেয়।

তার দাবির পক্ষে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লিখিত সাক্ষ্য সুপারিশ রয়েছে। ২০২৪ সালে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নিলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে অভিযোগ তার।

ফরিদপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ডেমরার গণহত্যা নারী নির্যাতনের ঘটনা ইতিহাসের অংশ। সামাজিক কারণে অনেক নির্যাতিত নারী আজও মুখ খুলতে পারেননি। বুলী ঘোষের দাবির পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

বিষয়ে বর্তমান ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, আবেদনটি তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের সময়ের। প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।