গাজীপুরের গ্রামগুলো এখন কাঁঠালে সয়লাব। যেদিকে চোখ যায় শুধু কাঁঠাল আর কাঁঠাল। বাড়ির উঠান, ঘরের বারান্দা সবখানে একই দৃশ্য। রাস্তাঘাটে, ভ্যানে, রিকশায়, অটোরিকশা, টেম্পো, ট্রাক ও রাস্তার মোড়ে ও বাজারে ক্ষুদ্র চাষি, ব্যবসায়ী, আড়তদার, ব্যাপারী ও পাইকারি বিক্রেতাদের স্তূপ করে কাঁঠাল বিক্রি করতে দেখা যায়। হাট-বাজারে বিক্রিও হচ্ছে দেদারছে। খাজা, গালা ও দুরসা এ তিন ধরনের কাঁঠাল হয়ে থাকে এ অঞ্চলে।
জেলার শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজার এখন এ অঞ্চলের পাইকারি কাঁঠাল বাজার হিসেবে পরিচিত। কাঁঠালের রাজধানী হিসেবে পরিচিত গাজীপুরে মৌসুমজুড়ে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলে জমজমাট বেচাকেনা। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বড় বাজার গড়ে ওঠায় ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন কৃষকরাও। বর্তমানে কাঁঠালের আকার ও মান ভেদে প্রতি কাঁঠাল ৮০ টাকা থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জৈনাবাজারের পাইকার আব্দুল আজিজ জানান, বর্তমানে কাঁঠালের দাম কমে যাওয়ায় দৈনিক ৩০ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে। কয়েকদিন আগে দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হয়েছে। জ্যৈষ্ঠ মাসে দৈনিক এক কোটি টাকারও বেশি কাঁঠাল বিক্রি হয়েছে এ বাজারে।
জৈনাবাজারে বসে কাঁঠালের সবচেয়ে বড় হাট। এ হাটে নোয়াখালী, সিলেট, কুমিল্লা থেকে পাইকারি ক্রেতারা ছুটে আসেন কম দামে সুস্বাদু কাঁঠাল কিনতে। সেগুলো নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রি করেন তারা। কাঁঠালের চাহিদা বেশি হওয়ায় ছোট (মুচি) অবস্থায়ও বাগান মালিকেরা পাইকারদের কাছে গাছ বিক্রি করে দেন। কাঁঠালের এ মৌসুমি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান হয় অন্তত কয়েক হাজার শ্রমিকের।
বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি হচ্ছে গাজীপুরের কাঁঠাল। শ্রীপুর ও কাপাসিয়ায় এবারও বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে কাঁঠাল সংরক্ষণের জন্য কোনো হিমাগার নেই। শুধু সংরক্ষণের অভাবে প্রতি মৌসুমে লাখ লাখ টাকার কাঁঠাল নষ্ট হয়। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও এর একটি বড় অংশ বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কাঁঠাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন অনেক কৃষক।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ঘেঁষে গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুর, বানিয়ারচালা, বাঘের বাজার, শ্রীপুরের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী, মাওনা চৌরাস্তা, কেওয়া বাজার, জৈনাবাজারে কাঁঠালের বাজার বসছে। জ্যৈষ্ঠের শুরুতে এরকম চিত্র চলে আষাঢ় মাসের শেষ পর্যন্ত।
শ্রমিক সাইফুল ইসলাম (৩৫), রফিকুল ইসলাম (৩২) জানান, আট বছর যাবত জৈনাবাজার আড়তে কাঁঠাল উঠানামা করছি। এখানে ৪-৫টি শ্রমিকের গ্রুপ রয়েছে। প্রতি গ্রুপে ১১ থেকে ১২ জন সদস্য। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টা ট্রাক-পিকআপ লোড করা যায়। সকাল ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত আড়তে কাজ করতে হয়। প্রতিটি কাঁঠাল গাড়িতে উঠালে ১.৫০ টাকা পান তারা। ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করে। তারা দৈনিক এক হাজার থেকে ১,৩০০ টাকা হাজিরা পায়।
আড়তদার কফিল উদ্দিন জানান, কাঁঠাল নোয়াখালী অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি যায়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালীর মাইজদী, উদারহাট, সেনবাগ, দাগনভূঞা, জমিরদারহাট, মুন্সিরহাট, বাংলা বাজার, কোম্পানিগঞ্জ, চাটখিল, রামগঞ্জ, চন্দ্রগঞ্জ, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, শহরাস্তি, সিলেট, বরিশাল, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, যশোর এলাকায়ও যায়। জৈনাবাজারে ২০টা কাঁঠালের গাড়ি (ট্রাক-পিকআপ) লোড হয় তার মধ্য ১৫টা গাড়ি নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারদের।
পাইকার জহিরুল ইসলাম ও ছফির উদ্দিন জানান, আড়তদার রয়েছেন ১৬ জন। প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার কাঁঠাল বেচাকেনা হয় এ বাজারে। প্রতিটি কাঁঠালে ৩ টাকা করে খাজনা দিতে হয়। প্রতি ট্রাকে ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ কাঁঠাল লোড করে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি ট্রাক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। পাঠাতে প্রতি কাঁঠালে খরচ হয় ৩০ টাকা।
নোয়াখালীর পাইকারী ব্যবসায়ী ফিরোজ আলম জানান, প্রতি কাঁঠাল নোয়াখালী পৌঁছানো পর্যন্ত ৩০ থেকে ৪০ টাকা খরচ হয়। গরম বেশি পড়লে একসঙ্গে অনেক কাঁঠাল বেশি পেকে গেলে বিক্রি কম হয়। এখান থেকে কাঁঠাল ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কিনলে নোয়াখালীতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। তা না হলে লাভ থাকে না। জৈনাবাজার থেকে ট্রাক নোয়াখালী পৌঁছাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে।
স্থানীয় কাঁঠাল ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন জানান, তিনি আড়াই লাখ টাকার কাঁঠাল (তিনটি বাগান) কিনেছেন। ওইসব বাগানে প্রায় দেড় হাজার কাঁঠাল গাছ আছে। কাঁঠাল পাকছে, পেড়ে এনে বাজারে বিক্রি করছি। এ পর্যন্ত খরচ বাদ দিয়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি করেছি। আরও ১৫ থেকে ২০ দিন কাঁঠালের ভরা মৌসুম থাকবে। শেষ সময়ের দিকে কাঁঠালের দাম বেড়ে যায়। আশা করছি ২ লাখ ২০ হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি করতে পারব।
পাশের ভালুকা উপজেলার রাজৈর গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন ৫২টি কাঁঠাল নিয়ে জৈনাবাজারে এসেছেন। সাইজও বিশাল। প্রতিটি ৫৮ টাকা করে দাম বলছে পাইকাররা। তবে তিনি ৭০ টাকা করে বিক্রি করবেন।
শ্রীপুর উপজেলা ছাড়াও ভালুকা, বাটাজোড় ও ত্রিশাল উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকেও এখানে কাঁঠাল নিয়ে আসে কৃষক ও খুচরা পাইকাররা। এছাড়া টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার কালমেঘা, স্যালঙ্গা, গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী মির্জাপুর, থেকের কাঁঠাল নিয়ে আসে পাইকাররা।
শ্রীপুরের বাগান মালিকরা প্রতিদিন ভোরে বাগান থেকে পাকা কাঁঠাল সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য ভ্যান, ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে আসেন বাজারে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই দেখা যায় মহাসড়কের ওপর ট্রাকের বহর। লাইন ধরে বিভিন্ন আড়তের সামনে থেকে ট্রাকে কাঁঠাল উঠছে।
স্থানীয়রা জানান, কাপাসিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৩২টি হাট-বাজারে মৌসুমি ফল বিক্রির জন্য আলাদা বাজার বা স্থান না থাকায় কৃষকদের সমস্যা হচ্ছে। ফড়িয়ারা বাজার মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দিচ্ছেন। কৃষকেরাও বাধ্য হচ্ছেন তাদের উৎপাদিত পণ্য অপেক্ষাকৃত কম দামে বিক্রি করতে। ফলে প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
কাপাসিয়ার আমরাইদ গ্রামের কৃষক রহিজ উদ্দিন বলেন, কাঁঠাল চাষের ব্যাপারে নেই কোনো সরকারি উদ্যোগ। নেই কোনো ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা। সরকারিভাবে যদি কাঁঠাল চাষ বৃদ্ধির ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে আরও বেশি ফলন পাওয়া যেত।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা (নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান) শ্রীপুর পৌরসভার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ বলেন, অনেক কৃষক ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কাঁঠাল উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং সময়মতো বিক্রি করতে না পেরে কাঁঠাল গাছ কেটে ফেলছেন। বাণিজ্যিকীকরণের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী তৈরিতে কৃষকেরা লাভবান হবেন। পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে কাঁঠাল হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানি পণ্য।
শ্রীপুরের টেপিরবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা লায়ন গণি মিয়া বাবুল বলেন, সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে কাঁঠাল বিক্রি করেন। যদি এ অঞ্চলে কাঁঠালকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক শিল্পখাত গড়ে তুলতে পারে, তাহলে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। রপ্তানি নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে কাঁঠালকে দেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীকে পরিণত করা সম্ভব। এ অঞ্চলের উৎপাদিত কাঁঠালের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা বিদ্যমান।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, বছরে গড়ে প্রায় ৭৮ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে খাজা জাতের কাঁঠাল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে। কাঁঠাল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা নিয়ে কাজ করা হবে।