অবশেষে সুন্দরবনে ফিরছে শিকারীর ফাঁদে আটকে পড়ে আহত সেই বাঘটি

আগামী ১২ জুলাই সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত  হচ্ছে শিকারীর ফাঁদে পড়ে আহত একটি বাঘ। সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্দারমানিক স্টেশনের শরকির খালসংলগ্ন বনে বাঘটিকে অবমুক্ত করবে বন বিভাগ। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বাঘটিকে বনে ছেড়ে দেবেন।

বন বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্যাটেলাইট কলার না পাওয়ায় বাঘটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এজন্য বাঘটির বিচরণ এলাকার আট কিলোমিটার জুড়ে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে তার চলাচল, শিকারি আচরণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হবে।

গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় হরিণ শিকারিদের পেতে রাখা একটি ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে প্রায় ১০ বছর বয়সী বাঘটি গুরুতর আহত হয়। খবর পেয়ে বন বিভাগের সদস্যরা ট্রাঙ্কুলাইজার প্রয়োগ করে তাকে উদ্ধার করেন এবং খুলনার বয়রায় অবস্থিত বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যান।

প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, ফাঁদে আটকে থাকার কারণে বাঘটির সামনের বাঁ পায়ের চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ক্ষতস্থানে সংক্রমণও দেখা দিয়েছিল। পরে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা, ড্রেসিং ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে বাঘিনীটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, বাঘ সাধারণত প্রজনন মৌসুম ছাড়া একাই নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করে। তাই সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাকে দ্রুত তার স্বাভাবিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া সবচেয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। যদিও স্যাটেলাইট কলার পাওয়া যায়নি, তবু বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সিসিটিভি নজরদারির মাধ্যমে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “চিকিৎসা শেষে বাঘটির শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তার ওজন বেড়েছে এবং স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতাও ফিরে এসেছে। বন বিভাগের ধারণা, এখন সে নিজেই শিকার ধরে খাদ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে। তাই দীর্ঘদিন পুনর্বাসন কেন্দ্রে না রেখে দ্রুত প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, “সুন্দরবনের একটি রয়েল বেঙ্গল বাঘ সাধারণত ১৪ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। প্রায় ১০ বছর বয়সী এই বাঘটিকে দ্রুত বনে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যথার্থ। কারণ দীর্ঘ সময় বন্দি অবস্থায় থাকলে তার স্বাভাবিক শিকারী আচরণ, গতি ও অভিযোজন ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।”

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু একটি আহত বাঘিনীকে বাঁচানোর সফল উদাহরণ নয়, বরং সুন্দরবনের বিপন্ন রয়েল বেঙ্গল বাঘ সংরক্ষণে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও প্রতিশ্রুতিরও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। শিকারীদের পাতা অবৈধ ফাঁদ অপসারণ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও তারা জোর দিয়েছেন।

সুন্দরবনের বন সংরক্ষক মো. ইমরান আহমেদ বলেন, “বাঘটিকে ১২ জুলাই আন্দারমানিক স্টেশন এলাকায় অবমুক্ত করবেন প্রতিমন্ত্রী। বাঘটিকে আগেই সেখানে নেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী ১২ জুলাই সকালে রওনা হয়ে স্পটে দুপুর নাগাদ পৌঁছবেন। এরপরই অবমুক্ত করা হবে।”

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনার (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, “১২ জুলাই বাঘটিকে অবমুক্ত করার প্রস্তুতি রয়েছে। এর আগে ১০ জুলাই ঢাকার একটি বিশেষ টিম বাঘের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে। তারা বাঘের ক্ষিপ্রতা ও শিকার ধরার অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করবেন। ১১ জুলাই আরেকটি বিশেষ টিম ঢাকা থেকে আসবে। এ টিম বাঘের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন।”