টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে এখনো বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে বান্দরবান। অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার প্রধান নদী সাঙ্গুর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাশাপাশি মাতামুহুরী নদীর পানিও বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে রয়েছে। এতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
রবিবার (১২ জুলাই) স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতিবৃষ্টির কারণে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকায় জেলার সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। দূরপাল্লার বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
তবে ঝুঁকি নিয়ে কিছু ছোট যানবাহন সীমিত পরিসরে চলাচল করছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে পানি ও কাদা জমে থাকায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা সদর ছাড়াও লামা, আলীকদম, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, থানচি ও রুমা উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকার বসতঘর, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় ঘরের ভেতর এখনো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি থাকায় মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর পানি ১৫ দশমিক ৮৭ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ১০ দশমিক ০৬ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে, যা বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানে ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে পাহাড়ি ঢলের কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত কমছে না।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর অনেকের খাদ্যসামগ্রী শেষ হয়ে এসেছে। বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।
কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেক কৃষকের সবজি ক্ষেত, ধান ও অন্যান্য ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। পাহাড়ি এলাকায় এখনো ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন অনেক পরিবার।
দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বিজিবি, রেড ক্রিসেন্ট ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রান্না করা খাবার, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ২৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, চলমান দুর্যোগে এ পর্যন্ত পাহাড়ধসে ৫ জন এবং পানিতে ডুবে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলাজুড়ে ২৬টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে দূর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ মে. টন চাউল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদকে।