চট্টগ্রামে ১৫টি উপজেলায় বন্যায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি উপজেলা সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশে ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও অবকাঠামোর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা। এ তিন উপজেলায় ৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ২০ হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ হাজার ৬৯৪টি টয়লেট। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) এ তথ্য জানিয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, তিন উপজেলায় মোট ১৯ হাজার ৯৬১টি নলকূপ সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ১১০টি নলকূপ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৭ হাজার ৮৫১টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব নলকূপের মধ্যে সরকারি ও ব্যক্তিগত উভয় ধরনের নলকূপ রয়েছে। এ তিন উপজেলায় বন্যায় ৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি সংস্থাটির।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, বন্যার পানি ও কাদা-মাটি জমে যাওয়া এবং পাহাড় ধসের কারণে হাজার হাজার নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন হাজারো মানুষ। পাশাপাশি এসব উপজেলায় পানি বাহিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে গেছে।
সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে তিন লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ উপজেলায় ৭ হাজার ১২৭টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে ৫ হাজার ১৫টি নলকূপ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া আরও ২ হাজার ১১২টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বিশুদ্ধ পানির মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি এ উপজেলায় ২ হাজার ১৫৬টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে তিন লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪ হাজার ৫২৩টি নলকূপ সম্পূর্ণ এবং ৩ হাজার ৫০৩টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার অনেক এলাকায় নলকূপের মুখ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কিংবা বন্যার কাদা ও দূষিত পানি ঢুকে পড়ায় সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ উপজেলায় নলকূপের পাশাপাশি ২ হাজার ৪২৭ টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে চন্দনাইশ উপজেলার দুই লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে ৪ হাজার ৮০৮টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারমধ্যে ২ হাজার ৫৭২ টি সম্পূর্ণ এবং ২ হাজার ২৩৬টি নলকূপ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার পানি নেমে গেলেও অধিকাংশ নলকূপে এখনও ঘোলা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি উঠছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করছে। বন্যায় এ উপজেলায় ১ হাজার ৬৬টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যার পর নলকূপের পানি দূষিত হয়ে পড়লে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন পানি বাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপগুলো জীবাণুমুক্ত করা, প্রয়োজনীয় মেরামত ও নতুন নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় দ্রুত নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ পুনঃস্থাপন, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ মেরামত এবং দুর্গত মানুষের মাঝে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, বন্যা পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। সেই ঝুঁকি মোকাবেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্যোগে জরুরি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হচ্ছে। এই ক্যাম্পে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি প্রদান করা হয়েছে- ফ্রি ওষুধ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্বাস্থ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।