চট্টগ্রামে চোখ রাঙ্গাচ্ছে ডেঙ্গু, ২৩ দিনে আক্রান্ত ২৯৮

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই চিত্র বদলে গেছে। বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে যেখানে মোট ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৯৮ জন, সেখানে শুধু জুলাই মাসের প্রথম ২৩ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫৬ জন। অর্থাৎ মাত্র ২৩ দিনেই ছয় মাসের মোট আক্রান্তের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে ডেঙ্গু।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা বৃষ্টিপাত, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এবং এডিস মশার দ্রুত বংশবিস্তার ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রধান প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এখনই কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার না করলে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

চলতি বছরে সবোচ্চ আক্রান্ত চলতি মাসে

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যলয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৫৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ২ জন। এরমধ্যে জানুয়ারিতে আক্রান্ত ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন আক্রান্ত এবং মারা গেছেন ১ জন, মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন, জুনে ১২২ জন এবং চলতি জুলাই মাসের ২৩ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৩৫৬ জন এবং মারা গেছেন ১ জন। জেলা সিভিল সার্জন কার্যলয় সূত্র আরও জানিয়েছে- আক্রান্তদের মধ্যে নগরের ২৬০ জন এবং জেলার বাসিন্দা ২৬২ জন। অন্যান্য জেলার  বাসিন্দা ১৩২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৩৭৬ জন, নারী ১৬৫ জন এবং শিশু রয়েছে ১১৩ জন।    

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বিগত বছরের আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড

ডেঙ্গুতে ২০২১ সালে ২৭১ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মারা গেছেন পাঁচ জন। ২০২২ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন পাঁচ হাজার ৪৪৫ জন; ওই বছর মারা যান ৪১ জন। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৮৭ জন; প্রাণ হারান ১০৭ জন। এটি ছিল চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলোর একটি। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে চার হাজার ৩২৩ জনে নেমে এলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৫। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন চার হাজার ৮৬৪ জন, ওই বছর ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

নগরে ডেঙ্গুর ৮ হটস্পট

সম্প্রতি নগরে এডিস মশার উপস্থিতি নিয়ে একটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। জরিপে নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ৮টি ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু মশার উপস্থিতি মিলেছে। তার মধ্যে রয়েছে- উত্তর কাট্টলী (ওয়ার্ড-১০), পাহাড়তলী (ওয়ার্ড-৩), আলকরণ (ওয়ার্ড-২), পশ্চিম বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৯), দক্ষিণ বালুচরা (ওয়ার্ড-৩৯), পাথরঘাটা (ওয়ার্ড-৩৪) এবং আন্দরকিল্লা (ওয়ার্ড-৩২)-এই আটটি ওয়ার্ডকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শনাক্ত হওয়া এডিস মশার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপটাই প্রজাতির, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এডিস এলবোপিকটাস, যা ডেঙ্গুর দ্বিতীয় প্রধান বাহক হিসেবে পরিচিত।

উপজেলায় আক্রান্ত বেশি সীতাকুণ্ডে

চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২৬২ জন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সীতাকুণ্ড উপজেলায়। এ উপজেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৪ জন। এছাড়াও বাকী ১৪টি উপজেলার মধ্যে লোহাগাড়ায় ২৩ জন, সাতকানিয়ায় ১৫ জন, বাঁশখালীতে ১৬ জন, আনোয়ারায় ১৩ জন, চন্দনাইশে ৭ জন, পটিয়ায় ১৮ জন, বোয়ালখালীতে ২ জন, রাউজানে ২৩ জন, ফটিকছড়িতে ৪ জন, হাটহাজারীতে ৮ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ১১ জন, মীরসরাইয়ে ১৮ জন এবং সন্দ্বীপে ৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

যা বলছেন স্বাস্থ্য বিভাগ

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ডেঙ্গু হচ্ছে মশাবাহিত রোগ। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে অবশ্যই মশা নিধন করতে হবে। চট্টগ্রামে দিন দিন ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ইতিমধ্যে জেলার সবকয়টি সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদের পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ডেঙ্গু মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বলেও জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।

যা বলছেন চসিক মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ২৬০ জন নগরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে উপজেলাগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তাই এখনই সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।”

মেয়র আরও বলেন, “এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে মাত্র ২ থেকে ৩ মিলিমিটার স্বচ্ছ পানিই যথেষ্ট। তাই বাসার ছাদ, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত পাত্র বা যেকোনো স্থানে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।”

চসিকের প্রস্তুতি

চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিধন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি বলেন, “মশা নিধনে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি যেসব ওয়ার্ডে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে সেসব ওয়ার্ডে ওষুধ ছিটানোর প্রতি বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। হটস্পটগুলোতে ওষুধ ছিটানোর জন্য ৬০ জনের একটি প্রশিক্ষিত টিম তৈরি করা হয়েছে। এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে সকাল-বিকাল লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, “আমাদের জনবল এবং ওষুধের কোনও স্বল্পতা নেই। আগামী ছয় মাসের ওষুধ গুদামে মজুত আছে। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ২০৫ জন স্প্রে ম্যান নিয়মিত কাজ করছেন। বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য কাজ করছে বিশেষ স্প্রে টিম।”