দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস-সংকটে ধুঁকতে থাকা নারায়ণগঞ্জের ডাইং কারখানাগুলো এবার আরও বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। পাইপলাইনে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় এতদিন যেসব কারখানা সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস সংগ্রহ করে কোনোরকমে উৎপাদন সচল রেখেছিল, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের নতুন নির্দেশনায় সেই পথও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে জেলার দেড় শতাধিক ডাইং কারখানার উৎপাদন কার্যত অচল হয়ে পড়ার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
২৬ জুলাই তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপক বিধান চন্দ্র মৈত্র সিএনজি স্টেশনগুলোর উদ্দেশে এক নির্দেশনা জারি করেন, যেখানে যানবাহন ছাড়া খোলা সিলিন্ডার বা ক্যাসকেড সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যান ও লরিতে সিএনজি সরবরাহ না করতে বলা হয়। নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়, এভাবে সিএনজি বিক্রি বাংলাদেশ গ্যাস আইন ও গ্যাস বিপণন বিধিমালা ২০২৬ এর পরিপন্থী এবং নিরাপত্তার দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ। এই নির্দেশনা জারির পরপরই নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।
সরেজমিনে সোমবার বিকেলে নগরের নতুন জেলখানা এলাকার একটি সিএনজি স্টেশনে দেখা যায়, একটি ডাইং কারখানার গ্যাস সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যান গ্যাস নিতে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে।এক ভ্যানচালক জানান, গত পাঁচ-সাত দিন ধরেই গ্যাস সংগ্রহে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছিল, আর সোমবার তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সরকারি নির্দেশনার কারণে আর সিলিন্ডারে গ্যাস দেওয়া হবে না। ওই স্টেশনের প্রকৌশলী সৈয়দ এলতাজ হাসান বাদশা জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান এমনিতেও আগে থেকে এভাবে গ্যাস সরবরাহ করত না, তবে এখন নতুন নির্দেশনার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন জানান, গ্যাস-সংকটের কারণে বর্তমানে অনেক কারখানায় দৈনিক গড়ে মাত্র তিন ঘণ্টাও উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। যেহেতু ডাইং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, তাই মাঝপথে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদিত কাপড়ের মানও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “এতদিন সিলিন্ডারে সিএনজি এনে সীমিত পরিসরে হলেও উৎপাদন চালু রাখছিল কারখানাগুলো, কিন্তু নতুন নির্দেশনার পর সেই সুযোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে সমিতিভুক্ত প্রায় দেড় শতাধিক কারখানার অধিকাংশেরই উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই অনেক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।“
তবে এই সংকট মোকাবিলায় কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে। এর একটি উদাহরণ আড়াইহাজারের মিথিলা টেক্সটাইল অ্যান্ড ওভেন ডাইং লিমিটেড, যারা বায়োমাস তথা ধানের তুষ ব্যবহার করে কারখানা সচল রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ মাহবুব খান হিমেল জানান, কয়েক বছর ধরে চলমান গ্যাস-সংকটের প্রেক্ষাপটে তারা আগে থেকেই বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যে কারণে তাদের উৎপাদন এখনো সচল আছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, পাইপলাইনে গ্যাসের অভাব এবং সিলিন্ডারে সিএনজি সংগ্রহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলার অধিকাংশ ডাইং কারখানা এখন চরম সংকটের মুখে পড়েছে।