বাংলাদেশ-মিয়ানমার কক্সবাজার সীমান্তে বেড়েছে ইয়াবা পাচার। নিত্যনতুন কৌশলে প্রতিদিন পাচার হচ্ছে কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা। বিশেষ করে সড়কপথে বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করে নানা কৌশলে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে বড় বড় ইয়াবার চালান। চলতি বছরের জুলাই মাসে গাড়িতে স্টিকার লাগানো বেশ কিছু ইয়াবার চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সড়কপথে ইয়াবা পাচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিলাসবহুল গাড়ি। কেউ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ব্যবহার করে, আবার কেউ সেনাবাহিনী, আইনজীবী বা রাজনৈতিক দলের লোগো, ভুয়া পরিচয়, পর্যটকের ছদ্মবেশ এবং গাড়ির ভেতরে গোপন চেম্বার তৈরি করে পাচার করছে ইয়াবা।
সোমবার (২৭ জুলাই) টেকনাফ হোয়াইক্যং বিজিবি চেকপোস্টে এক লাখ ৬ হাজার ইয়াবাসহ বিলাসবহুল একটি প্রাইভেট কার জব্দ করেছে বিজিবি। এসময় কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী এলাকার সাইফুল ইসলাম খোকন নামে একজন পাচারকারীকে আটক করা হয়।
একাধিক অভিযান, সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানাগেছে, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচারের পুরোনো রুট এখন পুরোপুরি সক্রিয়। কিছুদিন সমুদ্র পথে পাচার বৃদ্ধি পেলেও কৌশল পাল্টে আবারও স্থল পথে পাচার বেড়েছে মাদকের।
বাস, মাইক্রোবাস কিংবা মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ইয়াবা পাচারের অন্যতম নিরাপদ মাধ্যম হয়ে উঠছে প্রাইভেট কার ও বিলাসবহুল এসইউভি। শুধু চলতি জুলাই মাসেই কক্সবাজার, রামু ও উখিয়ায় পৃথক চারটি অভিযানে প্রাইভেট কার থেকে লক্ষাধিক ইয়াবা উদ্ধার করেছে পুলিশ, বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এসব ঘটনায় একাধিক পাচারকারী গ্রেপ্তার হলেও তদন্তে উঠে আসছে সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের সক্রিয়তার ইঙ্গিত।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে গত ২৩ জুলাই রাতে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কক্সবাজার সদর মডেল থানার পুলিশ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্টিকার লাগানো একটি বিলাসবহুল ল্যান্ড ক্রুজার জিপে তল্লাশি চালিয়ে সিটের নিচে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা ২৮,০০০ ইয়াবা উদ্ধার করে।
পুলিশ জানায়, গাড়িটি থামানোর সংকেত দিলে চালক পালানোর চেষ্টা করেন। পরে ধাওয়া করে গাড়িটি আটক করা হয়। এ ঘটনায় সাবেক সেনাসদস্য ওবায়দুল হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ২০১৯ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। গাড়িতে ইয়াবা থাকার বিষয়ে তিনি অস্বীকার করলেও পুরো ঘটনার পেছনে সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কিনা, তা তদন্ত করছে পুলিশ।
এর মাত্র একদিন আগে উখিয়ার শীলখালী এলাকায় ৬৪ বিজিবির চেকপোস্টে টেকনাফ থেকে চট্টগ্রামগামী একটি প্রাইভেট কারে তল্লাশি চালিয়ে ইঞ্জিনের পাশে বিশেষভাবে তৈরি গোপন স্থানে লুকানো সাতটি পোটলা থেকে ১০,৬৮৫টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা মো. ফরিদকে আটক করা হয়। বিজিবির জিজ্ঞাসাবাদে তিনি টেকনাফ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহর দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কের হিমছড়ি এলাকায় রামু থানা পুলিশের চেকপোস্টে নাম্বারবিহীন একটি প্রাইভেট কারের গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ৩০,০০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। গাড়ির চালক হোসেন আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, গ্যাস সিলিন্ডারকে বিশেষভাবে পরিবর্তন করে সেটিকে মাদক বহনের গোপন চেম্বারে পরিণত করা হয়েছিল, যা সাধারণ তল্লাশিতে শনাক্ত করা কঠিন।
এছাড়াও কয়েকদিন আগে রামুর রাবার বাগান এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অভিযানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মিরপুর ডিওএইচএসের স্টিকার লাগানো একটি প্রাইভেট কার থেকে ৬,০০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় দুই নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএনসির দাবি, পর্যটকের ছদ্মবেশে চলাচলকারী এই চক্রটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ব্যবহার করে নিরাপত্তা তল্লাশি এড়ানোর চেষ্টা করছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়াবা পাচারকারীরা এখন আর একক কোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে না। তারা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল উদ্ভাবন করছে। কখনও বিলাসবহুল গাড়ি, কখনও সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার, কখনও গ্যাস সিলিন্ডার, আবার কখনও ইঞ্জিনের ফাঁকা অংশ বা সিটের নিচে তৈরি গোপন চেম্বার ব্যবহার করে মাদক পরিবহন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নারী ও শিশু কিংবা পর্যটকের ছদ্মবেশও ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে চেকপোস্টে সন্দেহ কম হয়।
সেনাবাহিনীর স্টিকারযুক্ত ল্যান্ড ক্রুজার
গত ২৪ জুলাই কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ একটি বিলাসবহুল ল্যান্ড ক্রুজার জিপ গাড়ি ধাওয়া করে ২৮,০০০ ইয়াবাসহ ওবায়দুল হাসান নামের এক সাবেক সেনাসদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গাড়িটিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভুয়া স্টিকার লাগানো ছিল এবং সিটের নিচে বিশেষ গোপন চেম্বার তৈরি করে এই মাদক পরিবহন করা হচ্ছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকারযুক্ত প্রাইভেট কার
এর মাত্র কয়েকদিন আগে, ১৫ জুলাই রামুর রাবার বাগান এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) একটি সাদা রঙের টয়োটা কার থেকে ৬,০০০টি ইয়াবা উদ্ধার করে। ওই গাড়িটির সামনে দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো ছিল। এই ঘটনায় দুই নারীসহ তিন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হাইকোর্ট ও প্রেস স্টিকারের অপব্যবহার
সীমান্ত এবং মহাসড়কগুলোতে এরআগেও বিভিন্ন সময় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, বিচারক এবং বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমের ‘প্রেস’ স্টিকার ও লোগো ব্যবহার করে দামি হ্যারিয়ার, প্রাডো বা নোয়া গাড়িতে ইয়াবার বড় বড় চালান রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
গাড়ির ভেতরে যান্ত্রিক পরিবর্তন
মাদক বহনের জন্য সাধারণ তল্লাশিতে ধরা না পড়ার মতো ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গাড়ির এসি প্যানেল, গ্যাস সিলিন্ডার কেটে বা সিটের নিচে ও বডিতে এমনভাবে গোপন যান্ত্রিক চেম্বার তৈরি করা হচ্ছে, যা আধুনিক স্ক্যানার ছাড়া ধরা প্রায় অসম্ভব।
আইন ও স্টিকার বাণিজ্যের অপব্যবহার
যেকোনো সাধারণ কম্পিউটার বা প্রিন্টিং দোকান থেকে নামমাত্র মূল্যে এসব রাষ্ট্রীয় লোগো ও স্টিকার হুবহু নকল করে প্রিন্ট করা সম্ভব। কোনো ব্যক্তি আসলেই সেই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত কিনা, তা যাচাই করার মতো স্বয়ংক্রিয় বা ডিজিটাল কোনো ডাটাবেজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্টগুলোতে নেই। ফলে অপরাধীরা খুব সহজেই এই সুযোগের অপব্যবহার করছে এবং গাড়িগুলোকে মাদক বহনের নিরাপদ বাহনে পরিণত করছে।
কী করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
পুলিশ, বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি বা সামরিক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও প্রতীক ব্যবহার করে অপরাধ করা দেশের ভাবমূর্তি ও জনআস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা। এই নতুন কৌশল রুখতে সড়কগুলোতে এবং কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিশেষ তল্লাশি চৌকিগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে দামি গাড়ি বা রাষ্ট্রীয় স্টিকারযুক্ত গাড়ি হলেও সন্দেহ হলে তল্লাশি করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এই চক্রগুলোর পেছনে বড় কোনো সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেপথ্যের অর্থদাতা জড়িত রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কাজ করছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে মাদক পাচারের চেষ্টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এসব ঘটনার পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টিকার ব্যবহার করে মাদক পরিবহন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি ও চেকপোস্টভিত্তিক তল্লাশি আরও জোরদার করা হয়েছে।”
উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিনিয়ত বিলাসবহুল গাড়িতে করে ইয়াবা পাচার বেড়েছে। সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই টেকনাফ হোয়াইক্যং বিজিবি চেকপোষ্টে এক লাখ ছয় হাজার পিস ইয়াবাসহ বিলাসবহুল একটি প্রাইভেট কার জব্দ করেছে বিজিবির সদস্যরা।”
তিনি আরো বলেন, “সীমান্ত এলাকায় ইয়াবা পাচার ঠেকাতে বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং কারবারি ধরাও পড়ছে। সন্দেহভাজন যানবাহনের ওপর বিশেষ নজরদারি অব্যাহত থাকবে।”