গ্যাসের চাপে শূন্যতা, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে নেমেছে নীরবতা

শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে তীব্র গ্যাস-সংকটে বিপাকে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। কোথাও গ্যাসের চাপ নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়, আবার কোথাও ১ থেকে ৩ পিএসআইয়ের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একের পর এক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে নেমেছে অর্ধেকের নিচে।

সরেজমিনে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাস-সংকটে বেশ কিছু কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আবার কিছু কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে কোনোরকমে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ এবং লোকসানের আশঙ্কা।

সফিপুর এলাকার গোমতী টেক্সটাইল কারখানায় সপ্তাহখানেক আগেও শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর ছিল পুরো এলাকা। তবে গ্যাস-সংকটে এখন সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা। গ্যাসের অভাবে কারখানাটির টেক্সটাইল, ডাইং ও নিটিং সেকশন বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। এতে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

কারখানাটির মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা বলেন, “লাইনে গ্যাসের চাপ একেবারেই নেই। প্রথম দিকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি কিনে কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও পরে সেটিও সম্ভব হয়নি। তাই গত ১৯ জুলাই কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকেরা প্রতিদিন এসে ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করছেন।”

একই পরিস্থিতি মৌচাক এলাকার সাদমা ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেডে। প্রায় ৭ হাজার শ্রমিকের এই কারখানায় গ্যাস-সংকটে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে। কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা বলেন, “উৎপাদন চালু রাখতে কমপক্ষে ৪ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। অথচ সোমবার সকাল থেকে ১ পিএসআইও পাওয়া যায়নি। ফলে উৎপাদন বন্ধ রাখা ছাড়া কোনো উপায় নেই।”

আমবাগ এলাকার তাপস পিএন কারখানাটিও গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। কারখানাটিতে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করেন। মালিক তাপস কুমার তালুকদার জানান, গ্যাস-সংকটের কারণেই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

অন্যদিকে, কোনাবাড়ী এলাকার তুসুকা গ্রুপের একটি কারখানা জেনারেটরের মাধ্যমে চালু রাখা হয়েছে। তবে এতে প্রতিদিন অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। কারখানাটির পরিচালক তারেক হাসান বলেন, “উৎপাদন সচল রাখতে পাঁচটি জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। শুধু ডিজেল কেনার পেছনেই প্রতিদিন বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।”

গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক, চন্দ্রা, বোর্ডবাজার, টঙ্গী, শ্রীপুর ও কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস-সংকটের একই চিত্র দেখা গেছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, ছোট ও মাঝারি অন্তত অর্ধশত কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, “স্বাভাবিকভাবে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ ১০ থেকে ১৫ পিএসআই প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে অনেক কারখানায় ১ থেকে ৩ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় চাপ একেবারেই শূন্য।”

গাজীপুর জেলা ও মহানগর এলাকায় তিন হাজারের বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ গ্যাস-সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের ধারণা, সামগ্রিকভাবে শিল্প উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। তবে ঠিক কতটি কারখানা বন্ধ হয়েছে বা উৎপাদন কতটা কমেছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই শিল্প পুলিশ কিংবা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কাছে।

গাজীপুরের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক প্রকৌশলী বলেন, “গাজীপুরে গ্যাস-সংকট চলছে। তবে এর প্রভাবে ঠিক কতগুলো কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।”

গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২ এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, “এটি চলমান সংকট। তাই এর সঠিক পরিসংখ্যান দেওয়া কঠিন। তবে পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, “গ্যাস-সংকটে শুধু মালিকপক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, শ্রমিকেরাও এর বড় ধরনের প্রভাবের মুখে পড়ছেন।”

তিতাস গ্যাস গাজীপুর জোনের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. গোলাম ফারুক জানান, গাজীপুর জেলা ও মহানগরে প্রতিদিন প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট।