প্রক্সি আসামি দাঁড় করিয়ে জামিন, ধরা পড়তেই কারাগারে আইনজীবী

সিলেটে জাল-জালিয়াতির মামলায় যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আসামির বদলে আদালতে অন্য ব্যক্তিকে “প্রক্সি আসামি” হিসেবে দাঁড় করিয়ে আত্মসমর্পণ ও জামিন নেওয়ার অভিযোগে এক আইনজীবীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্ত আইনজীবীর নাম মো. হুমায়ুন কবির।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে ওসমানীনগরের দশহাল গ্রামের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মো. রফিক মিয়ার বিরুদ্ধে একটি জাল-জালিয়াতির মামলা বিচারাধীন ছিল। মামলায় রফিক মিয়া দেশে না এসেই লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। অভিযোগ, তার পরিবর্তে বিয়ানীবাজারের দিঘলবাক গ্রামের আমিন উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে আদালতে দাঁড় করানো হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, আইনজীবী হুমায়ুন কবিরের সহযোগিতায় আমিন উদ্দিন নিজেকে রফিক মিয়া পরিচয় দিয়ে ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর পর কিছুদিন হাজতবাস করেন তিনি। পরে ৫ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান।

জামিনের সময় আইনজীবী হুমায়ুন কবির ও তার সহকারী মো. জাকারিয়া জিম্মাদার হিসেবে বেইলবন্ড দাখিল করেন। এরপর ওই ব্যক্তি কারাগার থেকে মুক্ত হন।

তবে ঘটনার কয়েক দিন পরই বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মামলার ধার্য তারিখে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরী আদালতে আসামি যাচাইয়ের জন্য লিখিত আবেদন করেন।

পরে আদালতের নির্দেশে ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট (ঢাকা) থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ওই সময়ে রফিক মিয়ার দেশে আসা-যাওয়ার কোনো রেকর্ড নেই। এতে আদালতে তার পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে হাজির করার বিষয়টি সামনে আসে।

ঘটনাটি উদঘাটনের পর বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত বাদী হয়ে গত ২০ জুলাই চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলায় যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মো. রফিক মিয়া, তার হয়ে আদালতে দাঁড়ানো আমিন উদ্দিন, আইনজীবী মো. হুমায়ুন কবির এবং জিম্মাদার আইনজীবী সহকারী মো. জাকারিয়াকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪১৯, ১০৯ ও ৪৬৬ ধারায় মামলা করা হয়।

মামলার পর আইনজীবী হুমায়ুন কবিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত মঙ্গলবার সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার এজাহার ও নথি অনুযায়ী, হুমায়ুন কবির যশোর সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে ওকালতির সনদ লাভ করেন। পরে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন।

সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট আলী হায়দার ফারুক বলেন, “লন্ডনপ্রবাসী এক আসামির পরিবর্তে অন্য একজন আদালতে প্রক্সি দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। বিষয়টি বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের নজরে আসার পর আদালত বাদী হয়ে মামলা করে। ওই মামলায় আইনজীবী হুমায়ুন কবিরকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”

ঘটনাটি উদঘাটনকারী বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “রফিক মিয়া লন্ডনে অবস্থান করলেও তার নামে যিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন, তাকে দেখে তার সন্দেহ হয়। পরে তিনি আদালতে রফিক মিয়ার পাসপোর্টের গমনাগমনের তথ্য তলবের আবেদন করেন। তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর আদালত মামলা করে।

এ ঘটনায় আদালতপাড়ায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। আইনজীবীদের কেউ কেউ মনে করছেন, এমন ঘটনায় পেশাটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সিলেট জেলা বারের সভাপতি গোলাম এহিয়া চৌধুরী সোহেল বলেন, “বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন। তাই এ নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আইন অনুযায়ী অন্যান্য মামলার মতোই এ মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলবে।”