কারাগারে বন্দিত্বের সময়টা অলস বসে না থেকে কাজের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করছেন বন্দীরা। গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ ও মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার-৩ ঘুরে দেখা গেছে, বন্দীরা পোশাক তৈরি, সেলাই, সাবান উৎপাদন, বেকারি, প্রিন্টিং, ইলেকট্রনিকস, আসবাবপত্র তৈরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন। এসব কাজের মাধ্যমে তারা যেমন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তেমনি পারিশ্রমিকও পাচ্ছেন।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন নিজের পরনের ইউনিফর্ম দেখিয়ে বলেন, শুধু কারা কর্মকর্তাদের পোশাক নয়, সশ্রম কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত মোটা সাদাটে কাপড়ের সুতা তৈরি থেকে শুরু করে পুরো পোশাকও বন্দীরা নিজেরাই তৈরি করছেন। তারা সুগন্ধি ও কাপড় ধোয়ার সাবানও তৈরি করছেন। রাতে ব্যবহৃত কম্বল অত্যাধুনিক মেশিনে নিজেরাই পরিষ্কার করছেন।
গাজীপুরের কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সে কেন্দ্রীয় কারাগার-২ ও মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার-৩ সহ মোট চারটি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে মহিলা কারাগারের ক্যাম্পাসে বন্দীদের নকশিকাঁথা সেলাই করতে দেখা যায়। মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসে তারা কাজের পাশাপাশি গল্পও করছিলেন।
একজন নারী বন্দীর পাশে তার ‘প্রিজনার ক্যাশ’ বা ব্যক্তিগত তহবিলের কার্ড দেখা যায়। কাজের মজুরি এই হিসাবে জমা হয়। পরে ওই কার্ড ব্যবহার করে ক্যানটিন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যায়। চাইলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য খরচ করা বা পরিবারকে টাকা পাঠানোও যায়। একজন নারী বন্দী ২০ থেকে ২৫ দিনে একটি নকশিকাঁথা তৈরি করেন।
সাজাপ্রাপ্ত নারীদের জন্য ২০০৬ সালের বিশেষ সুবিধা আইনে ব্লক-বাটিক, সুচিশিল্প, হেয়ার কাটিং, বাঁশ ও বেতের কাজ, দরজিবিজ্ঞান ও কাপড়ের ফুল তৈরিসহ বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
মহিলা কারাগারের বিউটি পারলারেও বন্দীদের কর্মব্যস্ততা দেখা যায়। কেউ স্পা করছেন, কেউ চুল কাটছেন। সেবা দেওয়া ও নেওয়া, দুই পক্ষেই রয়েছেন বন্দীরা। যাঁরা রূপবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন, তাদের কেউ কেউ কারাগারে আসার আগে এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে তারা অন্য বন্দীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। পারলারে ৩৫ ধরনের সেবার মূল্যসহ একটি তালিকাও টাঙানো রয়েছে।
অন্য একটি কক্ষে বন্দীদের কেউ কাপড়ের মাপ নিচ্ছেন, কেউ কামিজ কাটছেন, আবার কেউ সেলাই মেশিন চালাচ্ছেন। থ্রিপিস তৈরির মজুরি ২৫০ টাকা, ওয়ানপিস ১৪০ টাকা এবং সাধারণ ব্লাউজ তৈরির মজুরি ১৫০ টাকা। তবে বর্তমানে নারী কারাগারে ব্লক-বাটিকের প্রশিক্ষণ বন্ধ রয়েছে। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আগে আবার এ প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
কাশিমপুর কারাগারের মূল ফটকের কাছে থাকা বিক্রয় ও প্রদর্শনী কেন্দ্রে বন্দীদের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ‘কারা পণ্য’ নামে এসব পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। অনলাইনেও এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রির লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট বন্দীদের দেওয়া হয়।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্দীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে দেশের প্রায় সব কারাগারেই বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মুক্তির পর সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে এসব প্রশিক্ষণ সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করছে কারা কর্তৃপক্ষ।
কারা অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৭৩টি কারাগারে বন্দীদের তৈরি পণ্য ৫ কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ সময়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ৮ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৮ জন। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া বন্দীরা পারিশ্রমিক হিসেবে পেয়েছেন ৩ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার টাকা।
বন্দীদের হাতে বিভিন্ন পণ্য তৈরির এই উদ্যোগকে কারা কর্তৃপক্ষ পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রম হিসেবে দেখছে। তাদের লক্ষ্য, কারাগার থেকে মুক্তির পর অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বন্দীরা যেন সমাজে সম্মানজনকভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।