চাহিদার তুলনায় সরবরাহ মাত্র ১১৬ মেগাওয়াট কম থাকা সত্ত্বেও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে খুলনা অঞ্চলের জনজীবন। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এ অঞ্চলের মানুষ। এতে বাসা বাড়ির পাশাপাশি মিল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থী ও অনলাইনভিত্তিক পেশাজীবীদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জনদুর্ভোগের সাথে অর্থনৈতিকও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
দিন রাতে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকায় পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় মিল-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
গ্রাহকরা বলেন, দিনে-রাতে কতবার যে বিদ্যুৎ যায় আর আসে, তার কোনো হিসাব নেই। ঘণ্টা মেপে মেপে লোডশেডিং চলায় এই ভ্যাপসা গরমে ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। শিশু আর বৃদ্ধদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপদ হচ্ছে। শহরেই ঘণ্টা পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুতের অভাবে পড়াশোনা বা দৈনন্দিন কোনো কাজই ঠিকমতো করা যাচ্ছে না।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাকিব জানান, রবিবার (৩০ আগস্ট) সকাল ১০টায় খুলনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫২২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪০৬ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১১৬ মেগাওয়াট। একই সময়ে বরিশাল জোনে ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২৫ মেগাওয়াট। দুই জোনে ৬৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৩১ মেগাওয়াট। মোট ঘাটতি ছিল ১৪৬ মেগাওয়াট।
ওজোপাডিকোর তথ্য বলছে, ওই সময়ে খুলনায় ৪২ মেগাওয়াট, বাগেরহাটে ৪ মেগাওয়াট, নড়াইলে ২ মেগাওয়াট, মাগুরায় ৮ মেগাওয়াট, কুষ্টিয়ায় ১০ মেগাওয়াট, ঝিনাইদহে ১৩ মেগাওয়াট, চুয়াডাঙ্গায় ১ মেগাওয়াট, ফরিদপুরে ৮ মেগাওয়াট, রাজবাড়ীতে ১৪ মেগাওয়াট, মাদারীপুরে ৬ মেগাওয়াট, শরীয়তপুরে ২ মেগাওয়াট এবং গোপালগঞ্জে ৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। বরিশাল বিভাগের বরিশালে ১৯ মেগাওয়াট, ঝালকাঠিতে ৩ মেগাওয়াট, পিরোজপুরে ৩ মেগাওয়াট, বরগুনায় ২ মেগাওয়াট এবং ভোলায় ৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট দুপুর ১টায় ২৩৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। ৮০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৬৭ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে খুলনা অঞ্চলের ৬২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪৫৬ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং হয় ১৬৯ মেগাওয়াটে। অন্যদিকে, বরিশাল অঞ্চলে ১৮১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১১১ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৭০ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে খুলনা জেলায় ৭০ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। বরিশাল জেলায় লোডশেডিং ছিল ৪৬ মেগাওয়াট। এছাড়া কুষ্টিয়ায় ২৩ মেগাওয়াট, রাজবাড়ীতে ১৭ মেগাওয়াট এবং ঝিনাইদহে ১৪ মেগাওয়াট, মাগুরায় ৮ মেগাওয়াট, ফরিদপুরে ৮ মেগাওয়াট, গোপালগঞ্জে ৭ মেগাওয়াট, চুয়াডাঙ্গা ও মাদারীপুরে ৬ মেগাওয়াট, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীতে ৫ মেগাওয়াট, বরগুনা ও ঝালকাঠিতে ৪ মেগাওয়াট, নড়াইল, শরীয়তপুর ও ভোলায় ৩ মেগাওয়াট, মেহেরপুর ও বোরহানউদ্দিনে ২ মেগাওয়াট, বাগেরহাট, ভেড়ামারা ও চরফ্যাশনে ১ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং হয়।
খুলনা মহানগরীর লবণচরার বাসিন্দা মো. শাহরিয়ার রাব্বি বলেন, “শনিবার বিকেল থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত অন্তত নয়বার লোডশেডিং হয়েছে। প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ এলেও সর্বোচ্চ ২০ মিনিট থাকে।”
তিনি জানান, তিনি ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। অনলাইনে কাজ করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো ক্লায়েন্টদের কাজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে কাজের ক্ষতির পাশাপাশি ক্লায়েন্ট হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, “লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি মিল-কারখানার উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে এক ধরনের ‘ইকোনমিক টর্চার’ শুরু হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বিশ্ব সৌরবিদ্যুতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত বিকল্প বিদ্যুতের দিকে যেতে হবে। যারা সৌরবিদ্যুৎ আমদানি করবে, তাদের প্রণোদনা দিয়ে এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।”
জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে নতুন করে নির্মাণ করা ছয়তলার বেশি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একটি ইজিবাইক চার্জ দিতে ১৩ থেকে ১৪ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে খুলনার ৩০ হাজার ইজিবাইক ও ১৫ হাজার অটোরিকশার জন্য দৈনিক ৫ লাখ ৮৫ হাজার ইউনিট (৫৮.৫ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, “বিদ্যুতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। অন্যথায় জনদুর্ভোগের সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।”