চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতির কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। গত চার দিন ধরে এই পরিস্থিতি চলছে বলে জানা গেছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এই অঞ্চলের বাসিন্দারা। এর প্রভাব পড়ছে বাসাবাড়ি ছাড়াও মিল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থী ও অনলাইনভিত্তিক পেশাজীবীদের কাজেও। এতে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকায় দেখা দিয়েছে পানির সংকটও। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে মিল-কারখানার উৎপাদন, ফলে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠানকে যাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
গ্রাহকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনে-রাতে কতবার বিদ্যুৎ যায়-আসে তার কোনো হিসাব নেই। ঘণ্টা মেপে মেপে লোডশেডিং চলায় এই ভ্যাপসা গরমে ঘরে টেকাই দায় হয়ে উঠেছে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। শহরাঞ্চলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, ফলে পড়াশোনা কিংবা দৈনন্দিন কাজ ঠিকমতো করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাকিব জানান, গত কয়েক দিনের চাহিদা ও সরবরাহের ফারাক ক্রমাগত সংকট তৈরি করছে। ২৯ আগস্ট খুলনা ও বরিশাল জোন মিলিয়ে মোট ঘাটতি ছিল ১৪৬ মেগাওয়াট। এরপর ৩০ আগস্ট ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৯ মেগাওয়াটে, যেখানে পিক আওয়ারে খুলনা অঞ্চলেই ঘাটতি ছিল ১৬৯ মেগাওয়াট এবং বরিশাল অঞ্চলে ৭০ মেগাওয়াট। ৩১ আগস্ট সার্বিক ঘাটতি কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১৭৯ মেগাওয়াটে। তুলনামূলক স্বস্তির খবর মেলে ১ সেপ্টেম্বর, যখন মোট ঘাটতি নেমে আসে ৬৬ মেগাওয়াটে খুলনা অঞ্চলে ২৭ মেগাওয়াট ও বরিশাল অঞ্চলে ৩৯ মেগাওয়াট। তবে সামগ্রিকভাবে খুলনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী, বরিশালসহ আশপাশের প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হয়েছে গ্রাহকদের।
খুলনা মহানগরীর লবণচরার বাসিন্দা মো. শাহরিয়ার রাব্বি জানান, শনিবার বিকেল থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত অন্তত নয়বার বিদ্যুৎ চলে গেছে তার এলাকায়, প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা করে। বিদ্যুৎ এলেও তা সর্বোচ্চ ২০ মিনিট স্থায়ী হচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং পেশার সঙ্গে যুক্ত এই বাসিন্দা বলেন, “অনলাইনে কাজ করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জরুরি হলেও লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো ক্লায়েন্টদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, যা কাজের পাশাপাশি ক্লায়েন্ট হারানোর শঙ্কাও তৈরি করছে।“
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি মিল-কারখানার উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যাকে তিনি এক ধরনের “ইকোনমিক টর্চার" বলে আখ্যায়িত করেন। বিশ্ব যখন দ্রুত সৌরবিদ্যুতের দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশকেও বিকল্প বিদ্যুতের পথে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি। সৌরবিদ্যুৎ আমদানিকারকদের প্রণোদনা দেওয়া এবং নতুন নির্মিত ছয়তলার বেশি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান তিনি। এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেরও আহ্বান জানান তিনি। তিনি জানান, একটি ইজিবাইক চার্জ দিতে ১৩-১৪ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, যে হিসেবে খুলনার প্রায় ৩০ হাজার ইজিবাইক ও ১৫ হাজার অটোরিকশার জন্য দৈনিক প্রায় ৫৮.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে। তার মতে, স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার না বাড়ালে জনদুর্ভোগের সঙ্গে শিল্প-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।