প্রতিবাদ করাতেই হামলা চালানো হয় এসবি সদস্যের ওপর, প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

আমিনবাজারে রাস্তায় অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তিকে মারধরের প্রতিবাদ করাই কাল হয়ে দাঁড়ায় পুলিশের স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের জন্য। ওই ঘটনার জেরে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আলতাফ হোসেন ও তার ছেলে আশ্রয় নেন কাছেই বড় ছেলের গেঞ্জি কারখানায়। সেখানে ঢুকেও তাদের ওপর লাঠি দিয়ে হামলা চালানো হয়, পেটানো হয় বেধড়ক। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান ৫৮ বছর বয়সী এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এ ঘটনায় জহিরুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে সাভার মডেল থানা পুলিশ। পুলিশ বলছে, হামলায় জড়িত আরও ১১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে সাভার থানাধীন আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি মসজিদের পশ্চিম পাশে এবং আলতাফ হোসেনের ছেলের মালিকানাধীন গেঞ্জি কারখানার ভেতরে এ ঘটনা ঘটে।

আলতাফ হোসেন এসবির ঢাকার মার্কেট ইন্টেলিজেন্স শাখায় কর্মরত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানার (এনায়েতপুর) সাধুপাড়া গ্রামে। প্রয়াত জুরাইন আলী শেখের ছেলে আলতাফ পরিবার নিয়ে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি এলাকায় বসবাস করতেন।

অটোরিকশা সরানো নিয়ে ঘটনার শুরু

পুলিশ জানায়, শনিবার রাতে নামাজ পড়তে বাসা থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট দূরে মদিনা সিটি মসজিদের সামনে যান আলতাফ হোসেন। মসজিদের পশ্চিম পাশে আবুল কালাম আজাদের একটি অটোরিকশার গ্যারেজ রয়েছে। গ্যারেজের সামনে সড়কের ওপর একটি অটোরিকশা রাখা ছিল।

এসময় উত্তর দিক থেকে একটি সাদা প্রাইভেটকার চালকসহ চারজন সেখানে আসে। সড়কে অটোরিকশা থাকায় তাদের চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। এ নিয়ে গাড়ি থেকে নামা ব্যক্তিদের সঙ্গে গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদের কথা-কাটাকাটি হয়।

একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিরা আবুল কালাম আজাদকে কয়েকটি চড় মারেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ঘটনার সময় আলতাফ হোসেন প্রাইভেটকারটির কাছেই ছিলেন। আবুল কালাম আজাদকে কেন মারা হলো, এমন প্রশ্ন তুলে তিনি প্রতিবাদ করেন। এ নিয়ে আলতাফের সঙ্গে ওই ব্যক্তিদের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, “আলতাফ ভাই আসছেন নামাজের জন্য, আমিও যাব নামাজে। তখন দেখে, গ্যারেজ মালিককে মারছে। তখন আলতাফ ভাই বললেন, উনাকে মারছেন কেনো? ওরা বলে, তুই কে? বলেই তাকে ধরলো। উনার সঙ্গে যা হইছে, হয়তো আমার সঙ্গেও হতে পারতো। ঘটনা যারা ঘটালো, এটি একটি জঘন্য ঘটনা। আমি এদের বিচার চাই, কঠোর শাস্তি দাবি করছি।”

গ্যারেজ মালিক আবুল কালামের ছেলে বলেন,“উনি আমাদের প্রতিবেশী। এখানে উনার একটা গার্মেন্টস আছে। আমার বাবাকে যখন মারা হচ্ছিল, তখন ওই আঙ্কেল এসে জিজ্ঞেস করে কি হইছে? তখন আব্বুকে ছেড়ে দিয়ে ওনার ওপর ওরা হামলে পড়ে। উনাকে মারে। উনি যখন বলে আমি পুলিশের লোক। তারপরও উনাকে মারে। উনি পরে উনার গার্মেন্টসে ঢুকে পড়ে আত্মরক্ষায়। সেখানে গিয়েও তাকে মারে। তারপর হাসপাতালে নিলে উনি মারা যায়।”

ছেলের কারখানায় ঢুকেও হামলা

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আলতাফ হোসেন ও তার ২৬ বছর বয়সী ছোট ছেলে আরিফুল ইসলাম সেখান থেকে সরে পাশের বড় ছেলের মালিকানাধীন মিনি গেঞ্জি কারখানায় চলে যান। মসজিদের ওই স্থান থেকে কারখানাটির দূরত্ব প্রায় ৭৫ গজ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও তাদের পিছু নিয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকে পড়েন। সেখানে লাঠি দিয়ে আলতাফ হোসেন ও তার ছেলে আরিফুলের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। পরে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।

আহত আলতাফ হোসেন ও তার ছেলেকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত ৯টা ১৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে আরিফুল ইসলাম গুরুতর আহতাবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আহতাবস্থায় ওই পুলিশ সদস্য ও তার ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়া অটোরিকশা চালক বলেন, “আমার অটোতে করে দুইজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন উনার মাথা থেকে রক্ত পড়ছিল।”

এদিকে এ ঘটনায় শোকবার্তা প্রকাশ করেছে এসবি। শোকবার্তায় বলা হয়েছে, আলতাফ হোসেন এসবি ঢাকার মার্কেট ইন্টেলিজেন্স শাখায় কর্মরত ছিলেন। তার মৃত্যুতে এসবি ঢাকার প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

শনাক্ত ১২, গ্রেপ্তার ১

ঘটনার পর সাভার থানা-পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করে। এর আগে, এ ঘটনায় নিহত কর্মকর্তার স্ত্রী শিউলি বেগম বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় এজাহারনামীয় ১৫ জন ও অজ্ঞাত ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। 

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জহিরুল ইসলাম (৩০) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি সাভারের বড়দেশি এলাকার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে। গ্রেপ্তার জহিরুল ইসলামের গাড়ি রাখাকে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূত্রপাত হয়।

সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম দুপুরে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “আমিনবাজার বড়দেশি এলাকায় একজন পুলিশ উপপরিদর্শককে গুরুতর আহত করার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্লক রেইড পদ্ধতিতে অভিযান চালায়।”

ওসি বলেন, “যার গাড়ি নিয়ে দ্বন্দ্ব, সেই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত জহিরুল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্ত্রী মামলা করেছেন। আসামির স্বীকারোক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও বিভিন্নভাবে খোঁজখবর নিয়ে অন্য আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় মোট ১২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ১১ জনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তবে রবিবার দুপুর পর্যন্ত পুলিশ মামলার নম্বর, গ্রেপ্তার জহিরুলের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগসহ মামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘‘সাভারের আমিনবাজারে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সাভার মডেল থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকায় মামলার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। আমরা প্রাথমিকভাবে আসামিদের শনাক্ত করেছি।’’

‘কেন মারা হলো’, প্রশ্ন করেছিলেন আলতাফ

এসবির সাভার জোনের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাসুদ রানা বলেন, “আলতাফ হোসেন এসবির সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন। তিনি সাভার জোনে কর্মরত ছিলেন না; ঢাকার একটি জোনে কর্মরত ছিলেন। আমিনবাজারে তার জায়গা রয়েছে এবং সেখানে তিনি বসবাস করতেন।”
মাসুদ রানা বলেন, “কেন, কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা প্রথমে আমরা জানতে পারিনি। পরে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।”

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, “গাড়ি পার্কিং নিয়ে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজের বাসার কাছেই পুলিশের ওই এসআই হামলার শিকার হন।”

তিনি বলেন, “একটি প্রাইভেট কার রাখা নিয়ে দুই পক্ষের ঝামেলা মেটাতে গিয়েই ওই এসআই ও তার ছেলে হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলামও বলেছেন, “প্রাথমিকভাবে গাড়ি নিয়ে বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত বলে জানা গেছে। তবে হামলার পেছনে আর কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”

ঘটনার পর থেকে সাভার থানা-পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের সিটিএসবি সদস্যদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।