তিন মাস পর সুন্দরবনে পর্যটকদের ঢল

তিন মাসের নীরবতা ভেঙে আবারও প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর হয়ে উঠেছে সুন্দরবন। হয়েছে পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত। নদ নদী, খালে মাছ ও কাকড়া ধরায় মেতে উঠেছে জেলেরা। বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমে জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ রক্ষায় ৯১ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ১ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হয় সুন্দরবন।

এদিকে, প্রথম ৬ দিনে ৩৬টি লঞ্চে বন ভ্রমণ করেন ২,৫২০ জন পর্যটক। এর মধ্যে ৮ জন বিদেশি রয়েছেন। প্রকৃতির টানে দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পাশাপাশি ৫,৮৪৪টি নৌকা বিএলসি নিয়ে মাছ ও কাকড়া আহরণে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছে। প্রতিটি নৌকায় ৩ জন করে জেলে হিসেবে ১৭,৫৩২ জন জেলে এখন সুন্দরবনে রয়েছেন।

সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে ১৪টি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। যেখানে প্রতিবছর কয়েক লাখ মানুষ ভ্রমণ করেন। এছাড়া বন বিভাগকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে বছরের বিভিন্ন সময় অর্ধলাখ বনজীববী মাছ, গোলপাতা ও মধু আহরণ করে থাকেন।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কয়েক দিনের মধ্যেই বাগেরহাটের করমজল পর্যটনকেন্দ্রে দেখা দিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। ছুটির দিনে সকাল থেকেই পর্যটকদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠছে এই পর্যটনকেন্দ্র। একের পর এক পর্যটকবাহী নৌযান ভিড়ছে ঘাটে।

পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের দল নিয়ে সুন্দরবনের অপরূপ প্রকৃতি উপভোগ করতে আসছেন দর্শনার্থীরা। কেউ ফুট ট্রেইলে হাঁটছেন, কেউ নদী-খালের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন, আবার কেউ বানর, হরিণসহ বনের বন্যপ্রাণীর দেখা পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন ছবি ও ভিডিও ধারণে।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে পর্যটকদের কোলাহল না থাকায় বন ও বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে থাকার সুযোগ পায়। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই প্রকৃতিপ্রেমীদের আগ্রহে আবারও সরব হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র।

অনেকের কাছে নৌযাত্রাও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। নদীর দুই পাশে সবুজ বন, ছোট ছোট খাল আর সুন্দরবনের নৈসর্গিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে নৌযানে চলার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে।

মোরেলগঞ্জের পর্যটক এস এম রিফাতুল ইসলাম জনি জানান, সুন্দরবন শুধু ঘোরার জায়গা নয়, এটি প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করার একটি অনন্য সুযোগ।

বরিশালের পর্যটক হোসেন সরদার জানান, অনেক দিন ধরে সুন্দরবনে আসার পরিকল্পনা করছিলাম। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সুযোগ পেয়ে চলে এসেছি। নৌপথে আসার সময় নদীর দুই পাশের দৃশ্যই ছিল অসাধারণ।

রাজশাহীর পর্যটক নিলিমা রানী জানান, করমজলে এসে মনে হচ্ছে শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে একেবারে অন্য এক জগতে চলে এসেছি।

সিলেটের পর্যটক আসমা আক্তার জানান, শিশুদের নিয়ে বইয়ে পড়া প্রকৃতি ও বাস্তব প্রকৃতিসহ বন্যপ্রাণীকে কাছ থেকে দেখতে পারার আগ্রহ ছিল। করমজলে এসে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভালো লাগছে।

করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, “দীর্ঘ তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। শুরুতে আবহাওয়ার কারণে পর্যটকের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। তবে আবহাওয়া অনুকূলে আসায় প্রতিদিনই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।”

সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার/ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “মাছের প্রজনন মৌসুম থাকায় তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে মাছের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। শুধু মাছ নয়, বন্য প্রাণীগুলোও এই সময়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়ায়। প্রচুর হরিণের ঝাঁক ও বাঘ কিন্তু দেখা যাচ্ছে। খাল পাড়ে এসে বসে থাকছে বাঘ, আমিও বাঘের ছবি তুলেছি। সব মিলিয়ে এই অবরোধের যে সুফল রয়েছে, তা আমরা পেয়েছি।”

তিনি জানান, ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবন পুর্ব বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় মাছ ধরার জন্য ২,৯২৮টি (খুলনা রেঞ্জে ১,৭৭৮ ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১৪৫০) এবং কাঁকড়া আহরণের জন্য ২,৮৯৩টি (খুলনা রেঞ্জে ১,১৯০ ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১,৭০৩) বিএলসি (নৌকার অনুমতি) দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৩টি লঞ্চে ৫ জন বিদেশিসহ ৬৪৬ জন পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, “সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের শরনখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় মাছ ধরার জন্য ১৯টি এবং কাঁকড়া আহরণের জন্য ৪টি বিএলসি (নৌকার অনুমতি) দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২৩টি লঞ্চে ৩ জন বিদেশিসহ ১,৮৭৪ জন পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। পশ্চিম বিভাগে মাছ আহরণ দুবলার চর কেন্দ্রিক হয়। যেখানে জেলেরা নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অবস্থান নিয়ে মাছ ধরে থাকেন।”

তিনি জানান, তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক টহল ফাঁড়ির সামনে রাজার মতো হেঁটে বেড়াতে দেখা গেছে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে। কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করার পর বাঘটি আবার বনের গভীরে চলে যায়। গত ২৪ জুলাই দুপুরে বিরল এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেন বনকর্মীরা।

এর দুই দিন পর, ২৬ জুলাই সকালে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য এলাকায় নদী সাঁতরে একটি বাঘকে বনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। বনকর্মীরা বাঘ দেখে আবেগে উল্লাস করেন। পাশাপাশি এই বাঘের ছবিও ক্যামেরাবন্ধী করেন তারা। এর কিছুদিন পরে আগস্টের প্রথম দিকে ঢাংমারি নদী পার থেকে একটি ছাগলকে ধরে খেয়ে ফেলে বিশালাকৃতির কুমির। কুমিরের ছাগল শিকারের দৃশ্য স্থানীয় এক ব্যক্তি ফোনে ধারণ করেন। এটি ছড়িয়ে পড়লে বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়। এছাড়া দেখা মিলছে হরিণের ঝাঁক। ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে বন্য শুকর, বানরসহ বিভিন্ন পশুকে।

বন্য প্রাণীদের এমন বিচরণ করে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে তিন মাস জেলে বাওয়ালী, বনজীবী ও দর্শনার্থী বন্ধের সুফল হিসেবে মনে করছেন বন সংশ্লিষ্টরা।