বাঙালি বলতেই আমাদের মাথায় আসে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। বাঙালির খাবারের পাতের মূল দর্শন ছিল এমনটাই- উঁচু থালা ভরা ধবধবে সাদা ভাত, সাথে পর্যাপ্ত ডাল কিংবা ছোট এক টুকরো মাছ। পেট ভরা মানেই ছিল ভাতে ক্ষুধা নিবৃত্তি।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা এই সাধারণ নিয়ম কিন্তু অনেকটা বদলে গেছে। সেই চিরচেনা চিত্রে এখন নিয়ে এসেছে বড় পরিবর্তন।
বাংলাদেশের খাবারের টেবিলে নীরবে ঘটে গেছে এক বড় বিপ্লব। গত দুই দশকে বাংলাদেশিরা তাদের দৈনিক ভাত খাওয়ার পরিমাণ ২৫.২ % কমিয়ে দিয়েছে। ভাতের থালার সেই পাহাড় এখন ছোট হয়ে এসেছে, আর সেখানে জায়গা করে নিয়েছে আরও বৈচিত্র্যময়, পুষ্টিকর ও রঙিন সব খাবার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পরিচালিত ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ’ (এইচআইইএস)-এর চারটি পর্বের জাতীয় গড় খাদ্য গ্রহণের উপাত্ত বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে।
খাদ্য তালিকার এই রূপান্তর কেবল খাবার পাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পারিবারিক অর্থনীতিতে।
বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, পরিবারের মোট খরচে খাদ্যের পেছনে ব্যয়ের অনুপাত আগের চেয়ে কমেছে। অন্যদিকে আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও যোগাযোগের মতো খাদ্যবহির্ভূত মৌলিক খাতগুলোতে ব্যয়ের হার বেড়েছে।
দেশে দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়া এবং মানুষের সার্বিক আয় ও সমৃদ্ধি বাড়ার সাথে সাথে-জীবনযাত্রা ও খরচের ধরনের এই মৌলিক পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘আয়ের প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ, পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলেই মূলত খাদ্যাভ্যাসে এই ধারা তৈরি হয়েছে।’’
খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে বাংলাদেশিদের মাথাপিছু দৈনিক ভাত খাওয়ার পরিমাণ ছিল ৪৩৯.৬ গ্রাম, যা ২০২২ সালে নেমে এসেছে ৩২৮.৯২ গ্রামে।
ভাত এখনো দেশের প্রধান খাদ্য থাকলেও-বিস্তৃত হতে থাকা খাদ্য তালিকায় এর একচ্ছত্র আধিপত্য কমেছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে। ২০০৫ সালে মাথাপিছু ফল খাওয়ার পরিমাণ ছিল দিনে মাত্র ৩২.৫ গ্রাম, যা ২০২২ সালে প্রায় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫.৪ গ্রামে-যা ১৯৩.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির নির্দেশ করে।
এ ছাড়া শাকসবজি খাওয়ার পরিমাণ ২৮.৬ শতাংশ বেড়ে দিনে ১৫৭ গ্রাম থেকে ২০১.৯২ গ্রামে পৌঁছেছে।
মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ ৪২.১ গ্রাম থেকে ৬০ শতাংশের বেশি বেড়ে দৈনিক ৬৭.৮৩ গ্রামে পৌঁছেছে।
এছাড়া প্রাণিজ আমিষ বা প্রোটিন গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় লাফ লক্ষ্য করা গেছে।