নতুন পে-স্কেলে গ্রেডভেদে সবার জন্যই কমছে বাড়ি ভাড়া

নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। সরকার নতুন ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’ অনুমোদন করেছে। এতে মূল বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রেডভেদে ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইলসহ বিভিন্ন ভাতায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামোতে সামরিক-বেসামরিক, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার সবার জন্য সমান থাকছে না। উচ্চপদে ইনক্রিমেন্টের হার কমানো হচ্ছে। ফলে গ্রেডভেদে যাদের বেতন বেশি, তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হারও তুলনামূলক কম হবে।

তবে নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন ১০০% থেকে ১৪২% পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে মূল বেতন বাড়লেও বাড়ি ভাড়া ভাতার হার কিছুটা কমানো হচ্ছে।

গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘জাতীয় বেতন কাঠামো ২০২৬’ অনুমোদন করা হয়। ওই সভার কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

জাতীয় বেতন কমিশন ১ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেছিল। তবে সচিব কমিটি তা কমিয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে। শেষ পর্যন্ত নতুন বেতন কাঠামোয় ১ম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া ৮ম ও ৯ম গ্রেডেও কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় বেতন বৃদ্ধির হার কমানো হয়েছে। এই দুই গ্রেডে কমিশন প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০৫% বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। সচিব কমিটি তা কমিয়ে ১০০% করার সুপারিশ করে। অন্য গ্রেডগুলোতে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার বহাল রাখা হয়েছে।

প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর হবে। পরবর্তী দুই ধাপে বাকি অংশ সমন্বয় করা হবে। বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

‘জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫’-এর প্রস্তাব পর্যালোচনার সময় মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয় সচিব কমিটি। একইসঙ্গে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতনের ব্যবধানও পর্যালোচনা করা হয়।

এরপর কমিশনের প্রস্তাবে কিছুটা কাটছাঁট করে নতুন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। তবে ২০টি গ্রেড রাখার সিদ্ধান্ত এবং ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব বহাল রাখা হয়েছে।

বাড়ি ভাড়া ভাতা

২০১৫ সালের বিদ্যমান পে-স্কেল অনুযায়ী, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০%-৬৫% পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা পান। নতুন পে-স্কেলে এই হার কমিয়ে ৪০%-৬০% করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মূল বেতনের তুলনায় বাড়ি ভাড়ার হার কমলেও গ্রেডভেদে মূল বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়ায় বাড়ি ভাড়া ভাতার পরিমাণও বাড়বে।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ছাড়া দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনভুক্ত এলাকা ও সাভার উপজেলায় বর্তমানে গ্রেডভেদে বাড়িভাড়ার হার মূল বেতনের ৪০%-৫৫%। নতুন বেতন স্কেলে এসব এলাকায় কর্মরতরা বাড়িভাড়া হিসেবে মূল বেতনের ৩০%-৫০% পাবেন।

একইভাবে, ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলার বাইরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য গ্রেডভেদে বাড়িভাড়ার হার হবে মূল বেতনের ২৫%-৪৫%। বর্তমানে এসব এলাকায় এই হার ৩৫%-৫০%।

চিকিৎসা ভাতা

বর্তমান বেতন কাঠামোতে সব কর্মচারীর জন্য মাসিক চিকিৎসা ভাতা ১,৫০০ টাকা। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনারদের জন্য এই ভাতা ২,৫০০ টাকা।

নতুন বেতন কাঠামোয় গ্রেড নির্বিশেষে ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৩,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সীরা মাসে ৪,০০০ টাকা পাবেন।

অন্যদিকে, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী পেনশনভোগীরা মাসে ৫,০০০ টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীরা ৬,০০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন।

মোবাইল ভাতা

নতুন পে-স্কেলে প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ফোন ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বর্তমানে ১ম থেকে ৩য় গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ১,৫০০ টাকা এবং ৪র্থ ও ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১,০০০ টাকা মোবাইল ফোন বিল পান। অন্য গ্রেডের কর্মকর্তারা এ সুবিধা পান না।

নতুন বেতন কাঠামোয় ১ম থেকে ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মাসিক মোবাইল ভাতা কমিয়ে ৫০০ টাকা করা হচ্ছে। ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে ১৫০ টাকা করে এই ভাতা পাবেন।

অন্যান্য ভাতা

জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়ার প্রেক্ষাপটে নতুন বেতন কাঠামোয় যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতা দ্বিগুণ বা তারও বেশি করা হচ্ছে।

বর্তমানে যাতায়াত ভাতা মাসে ৩০০ টাকা। নতুন স্কেলে তা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হচ্ছে। টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হচ্ছে।

বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা বাংলা নববর্ষ ভাতা হিসেবে মূল বেতনের ২০% পান। নতুন কাঠামোয় এটি কমিয়ে ১৫% করা হচ্ছে।

দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের পাহাড়ি ভাতা মূল বেতনের ২০% থাকছে। তবে পার্বত্য জেলা ও উপজেলা সদরের জন্য এর সর্বোচ্চ সীমা হবে ৫,০০০ টাকা এবং সদরের বাইরের এলাকার জন্য ৫,৫০০ টাকা।

হাওর, দ্বীপ ও চরভাতার ক্ষেত্রেও মূল বেতনের ২০% হার অপরিবর্তিত থাকছে। তবে এর সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫,০০০ টাকা।

এছাড়া শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটিজ এলাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি বিনোদন ছুটি ও ভাতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান হার ও পরিমাণই বহাল থাকবে।