সূর্য ডোবার পর শহরের আলো যত বাড়ছে, ততই এডিস মশার আচরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে। ডেঙ্গু ছড়ানো এই মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় বলে মনে করা হলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গবেষণায় সূর্যাস্তের পরও এডিস মশার সক্রিয় থাকার প্রমাণ মিলেছে।
বিদেশে পরিচালিত গবেষণাতেও দেখা গেছে, রাতে কৃত্রিম আলো মশার চলাফেরা ও কামড়ানোর সময় বাড়াতে বা দীর্ঘায়িত করতে পারে। ফলে বাংলাদেশের শহরগুলোতে বাড়তে থাকা স্ট্রিটলাইট, এলইডি বাতি ও অন্যান্য কৃত্রিম আলোর কারণে মানুষের এডিস মশার কামড়ের ঝুঁকির সময়সীমা বাড়ছে কি না এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
তবে ঢাকার এলইডি স্ট্রিটলাইট বা অন্য কোনো কৃত্রিম আলো সরাসরি ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়াচ্ছে এমন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে বাংলাদেশে কৃত্রিম আলোর বিভিন্ন মাত্রা ও পরিবেশে এডিস মশার আচরণ নিয়ে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন। ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সূর্যাস্তের পরও সক্রিয় এডিস
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার দীর্ঘদিন ধরে এডিস মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, “রাতে এডিস মশার সক্রিয়তার বিষয়টি এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।”
তিনি জানান, রাতে এডিস মশার ঘনত্ব কিছুটা কম থাকলেও তারা রাতে কামড়ায়। আগে ধারণা করা হতো, এডিস মশা মূলত সকাল ও বিকেলেই কামড়ায়।
২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অধ্যাপক কবিরুল বাশার ও তার সহকর্মীরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯০৪টি মশা সংগ্রহ করে গবেষণা করেন। বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মশার সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে তারা দেখতে পান, এডিস মশা সন্ধ্যার পরও সক্রিয় থাকে এবং রাত ৯টার দিকেও তাদের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
তবে ওই গবেষণায় কৃত্রিম আলোর মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকার মশার আচরণের তুলনা করা হয়নি। ফলে রাতের আলো এডিস মশার সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে কি না, তা ওই গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ঢাকার রাতও এখন আগের চেয়ে বেশি আলোকিত
এদিকে ঢাকার রাতের পরিবেশ গত কয়েক বছরে ব্যাপকভাবে বদলেছে। Environmental Sciences Europe এ প্রকাশিত ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভিআইআইআরএস স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঢাকায় রাতের কৃত্রিম আলোর বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে উঠে এসেছে। গবেষকদের হিসাবে, প্রতিবছর শহরের কৃত্রিম রাতের আলো প্রায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে বেড়েছে।
শহরের বিমানবন্দর, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও তেজগাঁও এলাকায় তুলনামূলক বেশি আলোর ঘনত্ব দেখা গেছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরেও পুরোনো স্ট্রিটলাইটের পরিবর্তে উজ্জ্বল সাদা এলইডি বাতির ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক এলাকা, ভবন ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থলও আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় আলোকিত থাকছে।
তবে স্যাটেলাইটের এসব তথ্য শুধু রাতে কৃত্রিম আলোর বিস্তার বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে; এর সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করে না।
কৃত্রিম আলো কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?
আন্তর্জাতিক কিছু গবেষণায় কৃত্রিম আলোর কারণে মশার রাতে সক্রিয়তার সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ২০২০ সালের একটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই মশার ৮২ শতাংশ দিনের বেলায় রক্ত পান করেছিল। রাতে এই হার ছিল ২৯ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ৩০ মিনিট সাদা আলোর সংস্পর্শে রাখার পর রাতে রক্ত পান করার হার বেড়ে ৫৯ শতাংশে পৌঁছায়।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশার ওপর পরিচালিত একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণাতেও কৃত্রিম আলোর দূষণ বেশি এমন এলাকায় রাতে মশার সক্রিয়তা বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে অতিরিক্ত গরম দিনের পর এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
তবে এসব গবেষণার ফল সরাসরি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না। কারণ মশার প্রজাতি, আবহাওয়া, তাপমাত্রা এবং বাস্তব পরিবেশে আলোর ধরন ও মাত্রার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন রেজা খান বলেন, কৃত্রিম আলো রাতে প্রাণীর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই প্রভাব প্রজাতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো মশা বা প্রাণীর ওপর আলোর প্রভাব কতটা, তা জানতে সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণায় একই ধরনের পরিবেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার সক্রিয়তা তুলনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি আলোর উজ্জ্বলতা, তরঙ্গদৈর্ঘ্য, রঙের তাপমাত্রা, কতক্ষণ আলো জ্বলছে এবং রাতের তাপমাত্রার মতো বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত শহরের উজ্জ্বল রাতকে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা যায় না। তবে শহরগুলো যখন সূর্যাস্তের পরও দীর্ঘ সময় আলোকিত ও সক্রিয় থাকছে, তখন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত একটি ধারণা দিনের বেলায় সক্রিয় এডিস মশা রাতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।