দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৬ দিনেই ডেঙ্গুতে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা পুরো আগস্ট মাসে মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে ৭২ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এক দিনেই ১ হাজার ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১ জনে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৭৫৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় এ বছর মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ৯১৬ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪ হাজার ১৬৬ জন।
ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বুধবার সবচেয়ে বেশি ৭৪৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া খুলনায় ৩৪৯, বরিশালে ১৮৬, চট্টগ্রামে ১৭৭, রাজশাহীতে ১৫৩, ময়মনসিংহে ৮৩, রংপুরে ৫৩ এবং সিলেটে ৯ জন ভর্তি হয়েছেন।
সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনাগুলোও রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া সাতজনের মধ্যে তিনজন খুলনা বিভাগের এবং চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের একজন করে রয়েছেন। এ বছর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৮০ জন। এরপর খুলনায় ৩২, ময়মনসিংহে ১৮, চট্টগ্রামে ১৬, বরিশালে ১৩, রাজশাহীতে ৮, রংপুরে ৩ এবং সিলেটে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুমের পর থেকে। জুলাইয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৯ হাজার ২০৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হলেও আগস্টে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫৩৬ জনে। সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে আক্রান্তের সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাসপাতালের ভর্তি রোগীর সংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কারণ গুরুতর অবস্থায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। খুলনা, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বান্দরবান, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় রোগী বাড়ছে। তার মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু কীটনাশক ছিটানো যথেষ্ট নয়; এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণও জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ বলেন, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে ধ্বংস করা সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি। একই সঙ্গে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা না হলে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সেপ্টেম্বরের অর্ধেক সময় পেরোনোর আগেই আগস্টের পুরো মাসের মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।



