Thursday, September 17, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

স্কুলে ভর্তি হলেও বড় ঘাটতি, ১০ শিশুর ৬ জনই গণিতে দুর্বল

এমআইসিএস  ২০২৫ এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম

দেশে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার হার বাড়লেও মৌলিক শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ছয়জনের বেশি গণিতে প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। একই বয়সী প্রায় অর্ধেক শিশু একটি সহজ ও বয়স উপযোগী গল্প পড়ে তার অর্থ বুঝতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথভাবে পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু গণিতে মৌলিক দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে না। আর ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু পড়া ও বোঝার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ন্যূনতম মান পূরণ করতে পারেনি।

প্রাথমিক স্তরেই বড় ঘাটতি

শিক্ষার ঘাটতি শুরু হচ্ছে স্কুলজীবনের একেবারে শুরুর দিক থেকেই। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ২৮ দশমিক ২ শতাংশ শিশু মৌলিক পড়ার দক্ষতা দেখাতে পেরেছে। আর মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু সংখ্যা চেনা ও তুলনা করা, যোগ করা এবং বিভিন্ন ধারার (প্যাটার্ন) মতো মৌলিক গাণিতিক কাজ করতে সক্ষম হয়েছে।

পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেও পরিস্থিতি পুরোপুরি কাটছে না। এ পর্যায়ে মাত্র ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী মৌলিক পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে।

জরিপে আরও দেখা গেছে, শব্দ পড়তে পারা মানেই সেই লেখা বোঝা নয়। ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ একটি গল্পের অন্তত ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পেরেছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় বোধগম্যতার প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছে মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশ।

সম্প্রতি প্রকাশিত ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্টের ফলাফলও একই ধরনের উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরেছে। এতে পঞ্চম শ্রেণির ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে গণিতে “নভিস” বা প্রাথমিক পর্যায়ের দক্ষতায় এবং ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বাংলায় একই স্তরে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে স্কুলে উপস্থিতিও কমছে

শুধু শেখার ঘাটতিই নয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের স্কুলে থাকা ও নিয়মিত উপস্থিতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে।

জরিপ অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে নিট উপস্থিতির হার ৮৫ দশমিক ১ শতাংশ। নিম্ন মাধ্যমিকে তা কমে দাঁড়ায় ৬০ দশমিক ১ শতাংশে এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশে। উচ্চ মাধ্যমিক বয়সে পৌঁছানোর পর ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু স্কুলের বাইরে চলে যায়।

প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার হার যেখানে ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বেশি পিছিয়ে

শিক্ষার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রভাবও স্পষ্ট। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ মৌলিক পড়ার দক্ষতা অর্জন করেছে। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে এই হার ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান রয়েছে। দরিদ্র পরিবারের মাত্র ২১ শতাংশ শিশু উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারে। ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ ছাড়া শহরের শিশুরা গ্রামাঞ্চলের শিশুদের তুলনায় মৌলিক পড়ার দক্ষতায় এগিয়ে রয়েছে। শহরে এই হার ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ, আর গ্রামে ৪৮ শতাংশ।

স্কুলে যাওয়ার আগেই দুর্বল ভিত্তি

শিক্ষার দুর্বলতা অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই শুরু হচ্ছে। ৩৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ প্রাক-প্রাথমিক বা শৈশবকালীন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়।

অন্যদিকে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর পাঠ্যবইয়ের বাইরে বাড়িতে অন্তত তিনটি বই রয়েছে।

তবে পড়ার মৌলিক দক্ষতায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা কিছুটা এগিয়ে। ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ মেয়ে এই দক্ষতা অর্জন করেছে, যেখানে ছেলেদের ক্ষেত্রে হার ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

এ ছাড়া বয়স অনুযায়ী সঠিক সময়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি না হওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু উপযুক্ত বয়সে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয় না।

শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজন

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন পাঠদান না হওয়া, কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরতা, গাইডবই এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের প্রকৃত বোঝাপড়া তৈরিতে বাধা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, এর ফলে প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্র ভাষা ও গণিতে শিশুরা যথাযথ দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। একই সঙ্গে তিনি সরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং পাঠ্যক্রমের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন।

বিবিএস ইউনিসেফের এই জরিপে দেশের ৬৪ জেলার ৬২ হাজার ৯৮০টি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৩৪ হাজার ৯৯০ শিশুর শেখার দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে জরিপের তথ্য বলছে, শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসাই শিক্ষার চূড়ান্ত সাফল্য নয়। বড় চ্যালেঞ্জ হলো তারা স্কুলে থাকার পাশাপাশি পড়া, বোঝা ও গণিতের মতো মৌলিক দক্ষতাগুলো যথাযথভাবে অর্জন করছে কি না।

   

About

Popular Links

x