খুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আজমুল হোসেনকে মারপিটের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ২ শিক্ষার্থী রিফাত ও প্রতাপ এবং জুসের দোকানের কর্ণধার রুবেল। ওই মেসে আজমুলের সঙ্গেই থাকতেন রিফাত ও প্রতাপ।
ঘটনার খবর পেয়ে রুবেল রাতেই মেসে এসে মারধরে অংশ নেয়। আদালতে এমনই স্বীকারোক্তি দিয়েছে পিরোজপুর থেকে আটক কৃষি ব্যাংকের ক্যাশ কর্মকর্তা রিফাত।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হক জানান, মঙ্গলবার রাতে হাসনাত হাবিব রিফাত মারধরের ঘটনায় নিজের অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
খুলনা মহানগর হাকিম-৪ আদালতের বিচারক ইব্রাহিম খলিল তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, হাসনাত হাবিব রিফাত ও প্রতাপ ওই মেসে আজমুলের সঙ্গে থাকতেন। ঘটনার রাতে তারা মারধরে অংশ নেন। খবর পেয়ে রুবেলও মেসে গিয়ে আজমুলকে মারধরে অংশ নেন বলে কর্মকর্তারা জানান।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন বলেন, “আজমুলকে মারধরের সময় রিফাত, রুবেল ও প্রতাপসহ ৮ জন উপস্থিত ছিলেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রিফাতের তথ্য মতে, মারধরের একপর্যায়ে আজমুল ছাদ থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে।” রিফাত কৃষি ব্যাংক বাগেরহাটের নওয়াপাড়া শাখার ক্যাশ অফিসার বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, “গ্রেপ্তার ৩ জনের কেউই এজাহারভুক্ত আসামি নয়। তবে, তিনজনই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আরও আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা প্রতাপ ও রুবেলকে ২৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে আদালতে হাজির করা হতে পারে।”
আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তাররা হচ্ছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফএমআরটি বিভাগের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী হাসনাত হাবিব রিফাত, এগ্রোটেকনোলজি বিভাগের ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রতাপ সরকার এবং খানজাহান আলী হলের গেটের সামনে রুবেল জুস কর্নারের মালিক তারেক হাসান রুবেল।
২১ সেপ্টেম্বর দিনগত রাতে পিরোজপুরের নেছারাবাদ থানার কুড়িয়ানা আদাবাড়ি গ্রাম থেকে রিফাতকে এবং ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে খানজাহান আলী হলের গেট থেকে রুবেলকে আটক করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ান (র্যাবের পরিবর্তিত নাম)।
২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে বরিশালের উজিরপুর থেকে প্রতাপকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও হরিণটানা থানা পুলিশের বিশেষ টিম।
এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ জানান, হত্যার পর থেকেই এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে সন্দেহভাজনদের আটকের সহযোগিতা চাওয়া হয়। রিফাত ও রুবেলকে আটক করে হরিণটানা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার আহাদুজ্জামান মিয়া জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বরিশালের উজিরপুরে প্রতাপের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে তাকে আটক করা হয়েছে। তাকে খুলনায় এনে হরিণটানা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত গভীর রাতে চুরির অপবাদ দিয়ে মেস ভবনের চতুর্থ তলা ও ছাদে নিয়ে আজমুলকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে আজমুল চারতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত্যু ঘোষণা করেন।
তিনি ছাদ থেকে লাফ দিয়েছেন, নাকি তাকে মারধরের পর ফেলে দেওয়া হয়েছে-তা তদন্ত করছে পুলিশ। এ ঘটনায় আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দীন বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ এ মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সময় নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হন নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ২১ সেপ্টেম্বর আজমুল হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। সেখানে কেসিসি প্রশাসক ও পুলিশ কর্মকর্তারা আসামিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো।