কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি আর পাওয়ারলুমের অসম প্রতিযোগিতায় চরম মন্দা ও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প। আসন্ন দুর্গাপূজাকে ঘিরে শিল্পটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে ব্যস্ততা বাড়লেও মজুরি কম পাওয়ায় হতাশ তাঁতিরা। সম্প্রতি ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেলেও পৃষ্ঠপোষকতা ও পুঁজির অভাবে শিল্পটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
এবার পূজা উপলক্ষে প্রায় ৯০ হাজার পিস তাঁত শাড়ি বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা ও তাঁতিরা সরকারের সার্বিক সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, জেলার টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী ও দেলদুয়ার উপজেলায় সবচেয়ে বেশি তাঁতের শাড়ি উৎপাদিত হতো। বর্তমানে এসব এলাকার অধিকাংশ তাঁত মেশিন বন্ধ। অনেকে তাঁত বিক্রিও করে দিয়েছেন। ফলে দিন দিন কমছে এ শিল্পে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা।
ঈদ কিংবা পূজা, উৎসবে নারী-পুরুষ সবাই নতুন পোশাক পরেন। নারীদের উৎসবের পোশাক মানেই শাড়ি, আর তাতে টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ির প্রতি রয়েছে আলাদা টান। ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবারও টাঙ্গাইল শাড়িতে এসেছে নতুন নতুন ডিজাইন।
তাঁতের রাজধানী পাথরাইল ছাড়াও বাজিতপুর, এলাসিন, করটিয়া, বল্লা, এনায়েতপুর, পোড়াবাড়ি, চারাবাড়ি ও বাঘিলসহ সব তাঁতপল্লি এখন তাঁতের খটখট শব্দে মুখর। তবু শিল্পটিতে অস্থিরতা কাটেনি।
২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ভারতের দিল্লিতে ইউনেস্কোর ২০০৩ কনভেনশনের আন্তঃসরকার কমিটির ২০তম অধিবেশনে “টাঙ্গাইল শাড়ি বুনন শিল্প”কে বিশ্ব অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেলদুয়ারের পাথরাইল তাঁতপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, আগের তুলনায় ক্রেতা কম। পুরুষদের পাশাপাশি বাড়ির নারীরাও তাঁতে কাজ করছেন। শ্রমিকদের মধ্যে একধরনের হতাশা স্পষ্ট।
ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর ধরেই এ ব্যবসায় মন্দা চলছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় তাঁতের সংখ্যা কমছে, যেগুলো আছে সেগুলোরও অবস্থা ভালো নয়। এর মধ্যে সুতার দাম বাড়ছে। পাওয়ারলুমের কারণে হ্যান্ডলুমের শাড়ির চাহিদা কমেছে, আবার হ্যান্ডলুমের শাড়ির দামও তুলনামূলক বেশি।
তাঁত শ্রমিকরা বলেন, পূজাকে ঘিরে ব্যস্ততা বাড়লেও বিক্রি আগের মতো নেই, মজুরিও কম। এই মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন। তবু বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন তারা। আগামী দুই সপ্তাহ কাজের চাপ বেশি থাকবে, এরপর আবার আগের চেনা রূপে ফিরবে তাঁতপল্লি।
স্থানীয়রা বলেন, তাঁত শুধু পেশা নয়, এ অঞ্চলের শত বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। একসময় বড়দের হাত ধরে ছোটরাও তাঁত বুনতে শিখত। এখন সেই ধারা থেমে যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কম মজুরি, মেশিনে তৈরি কাপড়ের প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি বন্ধ থাকায় অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের কারণে তরুণরা এ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ ব্যবসায়, কেউ চাকরিতে, কেউ বা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
৫০ বছর ধরে তাঁতের কাজ করা রঞ্জিত কুমার দাস বলেন, “পূজা উপলক্ষে ব্যস্ততা বেড়েছে। তিনি এখন জামদানি শাড়ি বুনছেন, যা তৈরি করতে প্রায় এক সপ্তাহ লাগে। এর মজুরি মেলে ২ হাজার ৫০০ টাকা। বাজারে সুতার দাম বেশি, আর আগের তুলনায় মেয়েরা শাড়িও কম পরছেন।”
২৫ বছর ধরে এ পেশায় থাকা সুধীর চন্দ্র দাশ হাফসিল্ক শাড়ি বোনেন। তার ভাষ্য, সপ্তাহে ৪ থেকে ৫টি শাড়ি তৈরি করতে পারেন, প্রতিটিতে সময় লাগে দুই দিন। প্রতি পিসে মজুরি ৭০০ টাকা। তিনি বলেন, “এ টাকায় কি সংসার চালানো সম্ভব? একজন ধানক্ষেতের কামলার মজুরিও এর চেয়ে বেশি।”
ধীর পাল বলেন, “পাওয়ারলুমের কারণে তাঁত শাড়ির বাজারে মন্দা আরও বেড়েছে। পাওয়ারলুমে দিনে ৮ থেকে ১০টি শাড়ি তৈরি করা গেলেও একটি নিখুঁত তাঁত শাড়ি বুনতে অন্তত দুই দিন লাগে।” পূজা উপলক্ষে এখন তাঁরা দিনে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করছেন।
ছানোয়ার হোসেন নামের আরেক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগে প্রচুর তাঁত শাড়ি চলত। মজুরি কম হওয়ায় নতুন কেউ কাজে আসতে চান না। ধান কাটলে দিনে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পাওয়া যায়, অথচ একটি শাড়ি বুনতে দুই দিন লাগলেও সমান মজুরি মেলে না।” মজুরি বাড়ানো হলে পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে চলা যেত বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা চান তারা।
এত সংকটের মধ্যেও দেশের নানা প্রান্ত থেকে ক্রেতারা টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লি ও জেলা শহরের শোরুমগুলোতে ভিড় করছেন। নিজের জন্য ও প্রিয়জনকে উপহার দিতে পছন্দের শাড়ি কিনছেন তারা। ক্রেতাদের মতে, টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ির মান ও গুণ দুটিই ভালো, তাই চাহিদা আছে। বিভিন্ন দিবসে তারা তাঁত শাড়ি পরতে পছন্দ করেন।
টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বলেন, “এ অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার তাঁত ছিল, এখন আছে মাত্র সাড়ে ৪০০টি। নতুন প্রজন্মকে এ শিল্পে আনতে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ দরকার, না হলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।” তার অভিযোগ, শিল্পটির প্রতি সরকারের উদাসীনতা আছে এবং শ্রমিক হারিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য, “দেশের সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু আমাদের কাপড়ের দাম কমেছে।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু ঋণ দিয়ে এ শিল্পকে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব নয়। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্থলপথে টাঙ্গাইল শাড়ির রপ্তানি চালু রাখতে হবে। কয়েক দিনের মধ্যেই সুতার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান জরুরি।”
টাঙ্গাইল চেম্বার অফ কমার্সের পরিচালক পলাশ বসাক বলেন, “দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৮০ থেকে ৯০ হাজার পিস শাড়ি বিক্রির আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। তবে এ শিল্পে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।”