খুলনায় গত দুই বছরে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ১০ নেতা-কর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব মামলার তদন্ত শেষ হয়নি এখনও। আটক হয়নি হত্যার সঙ্গে জড়িত মুল আসামি, হুকুমদাতা ও অর্থদাতারা। মামলার তদন্তও বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অপরাধীরা আরও বেপরোয়া।
চলতি বছরের গত ২৪ ও ২৭ অক্টোবর তেরখাদা ও বটিয়াঘাটায় যুবদলের তিন নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এর আগে মার্চে প্রকাশ্যে নিহত হন ছাত্রদলের সাবেক নেতা রাশিকুল আনাম রাশু ও শ্রমিক দল নেতা মাসুম বিল্লাহ। তার আগে নিহত হন দৌলতপুরে সাবেক যুবদল নেতা মাহাবুবুর রহমান মাহাবুব।
২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে হাসপাতাল রোডে পিটুনিতে মারা যান বিএনপি কর্মী বাবুল মোল্লা। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি দিঘলিয়ার সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মুরাদ খানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৪ মার্চ মাসুম বিল্লাহ এবং ১৬ মার্চ রাশু খুন হন। ১২ জুন লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকায় বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম গাজী ওরফে ঢাকাইয়া রফিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৬ সালের ২৫ আগস্ট রূপসায় ছেলে জয় ঢালীকে হত্যার ৫০ দিনের মাথায় ৫ অক্টোবর বাবা আক্তার ঢালী খুন করে দুর্বৃত্তরা। তারা উভয়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
এছাড়াও গত ২৬ অক্টোবর দিনগত রাতে খুলনার বটিয়াঘাটায় যুবদল নেতা সোহেল শেখ (৩৬) গুলিবিদ্ধ হন। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় যুবদলের র্যালি শেষে বটিয়াঘাটার নিজ বাড়ি ফেরার পথে চক্রাখালী মোড়ে সাবেক যুবদল নেতা ও ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য ওহিদুল ইসলাম বাদলকে (৩৮) তিন রাউন্ড গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ২৪ অক্টোবর দিনের বেলায় তেরখাদায় গুলিবিদ্ধ হন মধুপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি রামিম বিশ্বাস (৩২)। গত ২০ অক্টোবর তেরখাদার কাটেঙ্গা বাজারে যুবদল ও ছাত্রদলের দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ থেকে সাত জন আহত হন। চলতি বছরে তেরখাদাসহ কয়েকটি এলাকায় ছাত্রদল ও যুবদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধে সংঘর্ষে ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়।
গত ১৬ মার্চ দৌলতপুর কেডিএ কল্পতরু মার্কেটে গুলিতে নিহত ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাশিকুল আনাম রাশু হত্যার রহস্য উন্মোচন এবং মূল অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি। রাশুর বাবা শরিফুল আনাম ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি। তিনি বলেন, ‘বিএনপি করাই বোধ হয় আমাদের অপরাধ হয়ে গেছে।
৪ মার্চ মহানগরীর ডাকবাংলো মোড়ে প্রকাশ্যে রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার পরপরই অশোক ঘোষ নামে এক ব্যক্তিকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশ। তবে মামলার এজাহারভুক্ত বাকি আসামিরা এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি। মাসুম বিল্লাহর স্ত্রী ফাতেমাতুজ জোহারা বলেন, “বাচ্চাগুলোর সামনেই কীভাবে গুলি করল। ওদের ফাঁসি না হলে এই কষ্ট কখনও যাবে না।”
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ২১ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মানিক হাওলাদারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ১১ জুলাই নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় দৌলতপুর থানা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে।
দৌলতপুরের যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জাহিদুল ইসলাম জানান, মামলায় এ পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কিছু তথ্য-প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর রাতে ৩০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আমিন মোল্লা বোয়িংকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। ৪ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবির পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, “একের পর এক হত্যা হচ্ছে। বিচার না হওয়ায় আরেকটি হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে।”
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু জানান, তারা আর এমন হত্যাকাণ্ড দেখতে চান না। এ ধরনের ঘটনা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। তিনি খুলনার আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “খুলনার পুলিশ বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জেলায় কতিপয় অদক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগদানের পর থেকেই আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। বর্তমানের নগরীর প্রায় সবকটি থানার ওসিদের গাফিলতি চোখে পড়ছে। নগরীতে কয়েক ডজন আবাসিক হোটেলে রমরমা মাদক কারবার ও অসাজিক কর্মকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা অবনতির আরও একটি কারণ। এ সব হোটেল থেকে পুলিশ মাসোহারা নিচ্ছে।”
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, “মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
খুলনার জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) সরকার ওমর ফারুক বলেন, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৬ অক্টোবর থেকে জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও এসআরবির যৌথ বিশেষ অভিযান এবং ‘ব্লক রেইড’ জোরদার করা হয়েছে। গুলির ঘটনা এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”