সাজেকে অবরোধে প্রতিদিন ক্ষতি আড়াই কোটি টাকা

রাঙ্গামাটিতে পাঁচ দফা দাবিতে টানা আট দিনের সড়ক অবরোধে অচল হয়ে পড়েছে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। পর্যটক না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে পর্যটন নির্ভর ব্যবসায়ীদের আয়। পর্যটন খাতে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

অন্যদিকে, যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট  মানুষরা  দুর্ভোগে পড়েছেন।

সাজেক রাঙ্গামাটি জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও পর্যটনকেন্দ্রটির পরিবহন, আবাসন, খাবার ও বিপণন ব্যবসার সঙ্গে খাগড়াছড়ির বহু মানুষ যুক্ত। ফলে সাজেকের অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে দুই জেলার ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের ওপর।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল থেকে অবরোধের সমর্থনে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারী অ্যাসোসিয়েশনের নেতাকর্মীরা সড়কে অবস্থান নেন।

অবরোধের কারণে সাজেক-খাগড়াছড়ি সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় সাজেকের রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাটে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, “চলমান অবরোধের কারণে সাজেকে পর্যটন খাতে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে পর্যটন ব্যবসার ভরা মৌসুম। প্রতিবছর এ সময়ে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ হাজার পর্যটক সাজেক ভ্রমণে আসেন। কিন্তু অবরোধের কারণে পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে গেছে।”

তিনি জানান, সাজেকে বর্তমানে ১০৮টি রিসোর্ট চালু রয়েছে। নতুন করে নির্মাণাধীন রয়েছে ১৯টি এবং বন্ধ রয়েছে ২৬টি। সব মিলিয়ে রিসোর্টের সংখ্যা ১৫৩টি। এ ছাড়া চালু থাকা ২১টি রেস্তোরাঁ এবং ১০৮টি রিসোর্ট মিলে প্রায় এক হাজার কর্মচারী রয়েছেন। ব্যবসা বন্ধ থাকলেও কর্মচারীদের খরচ মালিকদের বহন করতে হচ্ছে।”

সাজেক-খাগড়াছড়ি সড়কের মাহিন্দ্রচালক মো. জসিম উদ্দিন জানান, এ সড়কে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি জিপ এবং ৫০ থেকে ৬০টির মতো সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাহিন্দ্র চলাচল করে। অবরোধের কারণে বর্তমানে এসব যানবাহনের চলাচল বন্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, “গত আট দিনে আমার প্রায় ২৫ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। গাড়ি চালাতে না পারায় আয় বন্ধ। জানি না, এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেব।”

পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় চালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট অন্য শ্রমজীবী মানুষের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য দয়াধন চাকমা বলেন, “কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারছেন না। পরিবহন বন্ধ থাকায় মিষ্টিকুমড়া, লাউ, কাঁচা শাকসবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।”

তিনি বলেন, “সাজেকের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অনেক কষ্টে দিনযাপন করছেন। গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় কৃষকরা খাগড়াছড়িতে ফসল বিক্রি করতে পারছেন না। এতে তাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।”

সাজেকের বাঘাইহাট বাজারের ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল জানান, অবরোধের কারণে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। কিছু দোকান খোলা থাকলেও বেচাকেনা নেই বললেই চলে।

তিনি বলেন, “সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ বাঙালি ও পাহাড়ি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।”

ব্যবসায়ীরা জানান, আয় বন্ধ থাকলেও দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও পরিবারের দৈনন্দিন খরচ বহনের চাপ রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

সাজেকের মেঘ সমুদ্র রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী যথেন ত্রিপুরা বলেন, “অবরোধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছে।”

তিনি বলেন, “এখানে বর্তমানে ওষুধের সংকটও দেখা দিয়েছে।এখানে একটি ছোট ওষুধের দোকান রয়েছে, কিন্তু সেখানে জরুরি ওষুধও পাওয়া যাচ্ছে না।”

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা বলেন, “অবরোধের কারণে সাজেক সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করছে না। তবে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে গাড়িতে করে সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে দ্রুত উত্তরণ প্রয়োজন।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধসহ পাঁচ দফা দাবিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারী অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে।

অবরোধের কারণে সারাদেশের সঙ্গে সাজেকের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলে খাদ্যপণ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।