ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন থেকে চার্জিং, নতুন নিয়মে যা থাকছে

সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। একইসঙ্গে জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে এবং প্রধান বাস রুটে ধীরগতির এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নতুন বিধিমালায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশার নিবন্ধন, চলাচলের রুট, গতিসীমা, পার্কিং ও ব্যাটারি চার্জিংয়ের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করা যাবে।  

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।  

‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ নামে এই বিধিমালা দেশের সব সিটি কর্পোরেশনের জন্য প্রযোজ্য হবে। এতে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জারি করা আগের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হয়েছে।

নিবন্ধন ও ফি

বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী বহনকারী ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি ৮,০০০ টাকা এবং চার যাত্রী বহনকারী ই-রিকশার ফি ১০,০০০ টাকা। নিবন্ধন নবায়নে যথাক্রমে ৪,০০০ ও ৫,০০০ টাকা দিতে হবে। ফিটনেস সনদের জন্য ফি ১,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নির্ধারিত ফরমে আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ সেগুলো যাচাই করবে। বুয়েটের নির্ধারিত কারিগরি ও নিরাপত্তা মান পূরণ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দিতে হবে। আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। আবেদনকারী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। নিবন্ধিত প্রতিটি ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত আলাদা নম্বর, নম্বরপ্লেট ও ব্লু বুক দেওয়া হবে। নম্বরপ্লেট দৃশ্যমান স্থানে লাগাতে হবে। একজন ব্যক্তি নিজের একটি এনআইডির বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি কর্পোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন নিতে পারবেন। তবে যে সিটি করপোরেশন থেকে নিবন্ধন নেওয়া হবে, অন্য সিটি কর্পোরেশনে বাণিজ্যিকভাবে সেই ই-রিকশা চালানো যাবে না।

ফিটনেস ও নিবন্ধনের মেয়াদ

নিবন্ধন ও নবায়নের জন্য বুয়েটের নির্ধারিত কারিগরি ও নিরাপত্তা মান পূরণ, ফিটনেস সনদ এবং ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধির প্রতিস্বাক্ষর থাকতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে নিবন্ধন বা নবায়ন করা যাবে না। আগে থেকে চলাচল করা ই-রিকশাগুলোও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্ধারিত মানে উন্নীত করা যাবে। এক্ষেত্রে ফিটনেস সনদ ও ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর নিতে হবে।

বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধনের তারিখ থেকে ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল হবে ১২ বছর। এই সময় শেষ হলে নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট বাতিল করা হবে। প্রতিটি ই-রিকশায় গতিমাপক যন্ত্র থাকতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ বা নিবন্ধনহীন ই-রিকশা চালানো যাবে না। কোনো যান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলাচলের অনুপযোগী হলে সেটির সামনে ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলাচল অযোগ্য’ লেখা দৃশ্যমানভাবে লাগাতে হবে এবং মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে।

চলাচলের রুট ও গতিসীমা

ই-রিকশা চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট রুট ও জোন ঠিক করবে সিটি করপোরেশন এবং ট্রাফিক বিভাগ। একটি জোনের নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলতে পারবে না। সরকারের পূর্বানুমোদন ও ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিটি সিটি করপোরেশন ই-রিকশার সংখ্যা, রুট, জোন ও রং নির্ধারণ করবে।

জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়াল এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস রুট, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডর, ফুটপাতসহ নিষিদ্ধ সড়কে ই-রিকশা চালানো যাবে না। এসব যানকে সড়কের বাম পাশ দিয়ে চলতে হবে। অবৈধভাবে ওভারটেকিং বা লেন পরিবর্তন করা যাবে না। গাড়ি চালানোর সময় চালক মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারবেন না।

ই-রিকশায় চালকসহ যাত্রীর সংখ্যা নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী হবে। দুই যাত্রী বহনের উপযোগী ই-রিকশায় চালকসহ তিনজন এবং চার যাত্রী বহনের উপযোগী ই-রিকশায় চালকসহ পাঁচজনের বেশি ওঠানো যাবে না। যাত্রীদের হাতে বহন করা মালপত্র ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না। হর্নের শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৪০ ডেসিবেল হতে পারবে।

ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। তবে স্কুল, হাসপাতাল, উপাসনালয় ও জনাকীর্ণ এলাকায় ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চালানো যাবে না।

চালকের প্রশিক্ষণ, পার্কিং ও চার্জিং

চালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। এজন্য স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া যাবে। প্রতিটি ওয়ার্ড বা উপযুক্ত স্থানে ই-রিকশার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করবে সিটি করপোরেশন। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

ব্যাটারি চার্জ করা যাবে শুধু কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ও সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্ধারিত গ্যারেজে। চার্জিংয়ের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা অন্য ব্যবস্থায় চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ ও ব্যাটারি বিনিময়কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান ও ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। চার্জিং স্টেশন স্থাপনে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঋণ সহায়তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও নজরদারি 

ই-রিকশার চালক ও মালিকদের অনুমোদিত যান এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনে ঋণ সহায়তা দিতে পারবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি সংস্থা।

ই-রিকশা ও এর ব্যাটারি উৎপাদন, আমদানি, ব্যবহার, পুনর্ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং এর অধীন বিধি ও নির্দেশনা মানতে হবে। পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলা যাবে না। ব্যাটারি পোড়ানোও নিষিদ্ধ।

ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে বা পৃথকভাবে বিধিমালা অমান্য করে চলাচল করা ই-রিকশা থামাতে পারবেন। সরকার ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জারি করা আগের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করে নতুন বিধিমালা কার্যকর করেছে।