নামে মিল থাকায় ১০ মাস ধরে কারাগারে নিরপরাধ আলমাস

নামের মিল ও ঠিকানার বিভ্রান্তির কারণে অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি ভেবে ১০ মাস ধরে কারাবন্দী থাকা নিরপরাধ মো. আলমাসকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রবিবার (৮ নভেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে কারা কর্তৃপক্ষকে এই নির্দেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী তানভীর আহমেদ এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন হানিফ।

এর আগে গত ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে দাখিল করা বিচারিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ত্র মামলার প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছ বিচারপ্রক্রিয়ার শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, ভুলবশত কারাগারে আটক থাকা মো. আলমাস ঢাকার দোহার উপজেলার কুসুমহাটির বাসিন্দা শেখ খলিলের ছেলে। তিনি ওই মামলার মূল আসামি নন।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, মিরপুর থানার একটি অস্ত্র আইনের মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছের বাড়ি ঢাকার দোহারের নয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়াইর গ্রামে এবং তাঁর পিতার নাম খলিলুর রহমান। তবে নাম ও ঠিকানায় আংশিক মিল থাকায় পুলিশ নিরপরাধ মো. আলমাসকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এ ঘটনায় আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন ভুক্তভোগী আলমাসের পরিবার। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত ঘটনার বিচারিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন এবং ঢাকার একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে নিরপরাধ আলমাসকে গ্রেপ্তারের পেছনে বেশ কিছু গুরুতর ভুল ও অসংগতির কথা তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, মূল মামলার ফরোয়ার্ডিং, পুলিশ প্রতিবেদন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় আসামির ঠিকানায় গরমিল ছিল। গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের গ্রাম দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন হলেও প্রকৃত আসামির গ্রাম পূর্ব ধোয়াইর একই ডাকঘরের অধীন হওয়ায় এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এ ছাড়া দুজনের পিতার নামের আংশিক মিল থাকলেও দাদা ও অন্যান্য বংশীয় পরিচয়ে ভিন্নতা রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল ও দাদা শেখ নওয়াব আলী; পক্ষান্তরে প্রকৃত আসামি আলমাছের বাবার নাম এজাহার অনুযায়ী খলিল আহম্মেদ এবং দাদা শেখ শহর আলী। ভাইবোনের সংখ্যা এবং পারিবারিক পরিচয়েও বিস্তর ফারাক পাওয়া যায়।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দুজনের বয়সের পার্থক্যের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। ২০০২ সালে প্রকৃত আসামি আলমাছের বয়স ২৪ বছর উল্লেখ করা হলেও, গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের জন্ম ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর (সে হিসাবে ২০০২ সালে তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর)। দুই ব্যক্তির বয়সের ব্যবধান প্রায় সাত বছর। এ ছাড়া জীবনযাপনের ধরন ও পেশায়ও বড় পার্থক্য রয়েছে। মামলার প্রকৃত আসামি মিরপুরের পাইকপাড়ায় বসবাস করতেন এবং পেশাগতভাবে বেকার ছিলেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, ভুলবশত কারাবন্দী আলমাস কৃষিকাজ ও বৈদ্যুতিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

বিচারিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এই সমস্ত অসংগতি ও বাস্তব চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে আসার পর হাইকোর্ট বেঞ্চ কারাবন্দী নিরপরাধ মো. আলমাসকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার এই আদেশ দেন।