বাগদা চিংড়িতে মড়ক, ক্ষতির মুখে বাগেরহাটের চাষিরা

সাদা সোনা খ্যাত বাগেরহাটে বাগদা চিংড়ি মৌসুমের শুরুতেই প্রচণ্ড তাপদাহ ও ভাইরাসে আশঙ্কাজনক হারে মরে যাচ্ছে ঘেরের চিংড়ি। উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে চিংড়ি চাষে এমন বিপর্যয়ে জেলার অধিকাংশ চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, ভাইরাসের পাশাপাশি ঘেরে পানি স্বল্পতা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও হঠাৎ বৃষ্টির কারণে চিংড়ি মরছে। এছাড়া চাষিরা মৎস্য বিভাগের পরামর্শ গ্রহণ না করায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি মৎস্য বিভাগের।

জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৬৬ হাজার ৭‘শ ১৩ হেক্টর জমিতে ৭৮ হাজার ৬‘শ ৮৫টি বাগদা ও গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। জেলায় চিংড়ি চাষি রয়েছেন প্রায় ৭৩ হাজার।  

জেলার রামপাল উপজেলার মুজিবনগর এলাকার চাষি মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, “ঘেরে মাছ ছেড়ে তিন চার মাস খাবার দিয়ে যখন মাছ বিক্রির সময় হয়েছে, তখনই মাছে মড়ক লাগল। যখন দুই একটা করে মাছ মরছিল, তখন দোকান থেকে বিভিন্ন ওষুধ দিয়ে মড়ক ঠেকানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।”

বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া এলাকার চিংড়ি চাষি রিয়াজ শিকদার বলেন, “ঋণ করে ছয় বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বাগদা চিংড়ি চাষ করেছিলাম। কিন্তু চিংড়ি যখন ৭০-৮০ পিসে কেজি বা গ্রেড হয়েছে, তখনই ভাইরাস লেগে সব মরে গেল।”

উপজেলার যাত্রাপুরের তরুণ চাষি শেখ বাদশা বলেন, “২০১৭ সাল থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি ৬০ শতাংশ জায়গা নিয়ে চিংড়ি ও সাদামাছ চাষ শুরু করি। প্রথম বছর মোটামুটি লাভবান হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুই বছর পর থেকে লোকসান শুরু হয়। গত দুই বছরে লাভের বদলে শুধু ক্ষতি হচ্ছে। প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু টাকা আয় করি, তাও এই চিংড়ি চাষের পিছনে চলে যায়। এখন আমি নিঃস্ব হয়ে পড়েছি।”

রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষি রাজীব সরদার বলেন, “আমাদের এখানে ৯০ ভাগ ঘেরের চিংড়ি মরে শেষ। গত বছর ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও করোনাভাইরাসের কারণে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আশা ছিল চলতি মৌসুমে ঘেরের পরিবেশ ভালো যাবে এবং গত বছরের লোকসান উঠে আসবে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে যেভাবে চিংড়িতে মড়ক দেখা দিয়েছে তাতে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব কি না জানি না।” 

বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষি সমিতির সভাপতি সুমন ফকির জানান, দিন দিন বাগেরহাটে চিংড়ি চাষের পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। একদিকে পোনা সংকট অপরদিকে রোগের প্রাদুর্ভাব। এভাবে চলতে থাকলে দরিদ্র চিংড়ি চাষিদের পেশা বদলানো ছাড়া উপায় থাকবে না।

এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস.এম রাসেল বলেন, “জেলার নয় উপজেলার মধ্যে রামপালের দুটি ইউনিয়নে বেশি চিংড়ি মারা যাওয়ার তথ্য আমরা পেয়েছি। ইতোমধ্যে সেখান থেকে চিংড়ির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কি কারণে চিংড়ি মারা যাচ্ছে, সেটি বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা ধারণা করছি অতিরিক্ত গরম, হোয়াইট স্পট ভাইরাস বা মৌসুমের শেষে ভাইরাস যুক্ত চিংড়ি ঘেরে ছাড়ার কারণে এমনটা হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “জেলার অধিকাংশ ঘের প্রস্ততের আগে চাষিরা ব্লিচিং পাউডারসহ ভাইরাস মুক্ত করণের যে সব পদ্ধতি আছে তা প্রয়োগ না করে গতানুগতিকভাবে ঘের প্রস্তুত করে চিংড়ি ছাড়েন। এছাড়া চিংড়ি পোনা ছাড়ার আগে পোনা ভাইরাস মুক্ত কি না তাও পরীক্ষা করেন না। চাষিদের ঘের প্রস্তুত ও পোনা ছাড়ার সঠিক পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।”