১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ৬ বছর ধরে চলা এ যুদ্ধে একদিকে অক্ষশক্তি হিসেবে ছিল জার্মানি, জাপান, ইতালি আর মিত্রপক্ষের ভুমিকায় ছিল যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির হয়ে অনেক বাংলাদেশিই লড়াই করছিলেন। তাদের মধ্যে ৯ জন এখনও জীবিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির হয়ে লড়াই করা সেই জীবিত বাংলাদেশিদের মধ্যে অন্যতম কছির উদ্দিন আকন্দ। ঐতিহাসিক সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির পিএনআর (পাইওনিয়ার কোর) আকন্দের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের নগর কুসুম্বি গ্রামে। বিশ্বযুদ্ধে অবদান এবং ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে ভাতা-সহায়তাও পান তিনি।
কছির উদ্দিন আকন্দের বয়স এখন ৯৭। তবে এখনও স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারেন কারও সহায়তা ছাড়াই। এ বয়সেও মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। চশমা ছাড়াই পড়তে পারেন তিনি। আর স্মরণশক্তিও আগের মতোই প্রখর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কছির উদ্দিন আকন্দ জানান, ১৯৪৪ সালের ৫ মার্চ তিনি সৈনিক হিসেবে তৎকালীন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পান। কলকাতায় এক মাসের রাইফেল ট্রেনিংয়ের পর ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির পাইওনিয়ার (পিএনআর) পদে যুক্ত হন। বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) জাপানি বিমান হামলার পর বেশ কিছুদিন শহরটির পুনর্নিমাণ কাজেও তিনি অংশ নেন। এরপর পুনেতে সম্মুখযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) পাঠানো হয়।
তিনি আরও জানান, বার্মায় বিশাল এবং ঘন অরণ্যে হিংস্র জীবজন্তুর থাবা এড়িয়ে কষ্টকর দিন কেটেছে তার। আফ্রিকাসহ ১১ জাতির সৈন্য দিয়ে তাদের ইউনিটটি গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রায় এক বছর জঙ্গলে থেকে যুদ্ধ করার পর তারা জাপানি বাহিনীকে দমনে সক্ষম হন। এরপর এক মাসের ছুটি নিয়ে নওগাঁর বাড়িতে আসেন কছির উদ্দিন। ছুটি কাটিয়ে তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে যোগদান করেন। এরপর আবারও তাকে পাঠানো হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা পুনর্নির্মাণের কাজে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ, অবদান এবং বীরত্বের জন্য বেশ কিছু পদকও পেয়েছেন কছির উদ্দিন আকন্দ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৩৯-৪৫ স্টার, বার্মা স্টার মেডেল এবং ওয়ার মেডেল ১৯৩৯-৪৫। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালের ১৭ আগস্ট তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন।
বর্তমান জীবন সম্পর্কে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এ যোদ্ধা বলেন, “তিন মাস পরপর সশস্ত্রবাহিনী রাজশাহী ডিএএসবি অফিস থেকে ১৬ হাজার টাকা ভাতা পাই। সেটা দিয়েই খাবার ও ওষুধ খেয়ে বেঁচে আছি। ৯৭ বছর বয়স হয়েছে আমার। বার্ধক্যজনিত কারণে বিভিন্ন রোগব্যাধি বাসা বেঁধেছে শরীরে।”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে কছির উদ্দিন আকন্দকে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি দেশেই ফিরে আসেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এ সম্মুখযোদ্ধা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি পাননি। এ নিয়ে তার মনে রয়েছে কষ্ট । জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে ইচ্ছুক তিনি।
আক্ষেপের সুরে কছির উদ্দিন আকন্দ বলেন, “দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আমাকে কেউ মূল্যায়ন করছে না। কেউ আমাকে কখনও ডাকে না, খোঁজ-খবর নেয় না। হয়ত যেকোনোদিন আমি মারা যাব। মৃত্যুর পরে নয়, আমি বেঁচে থাকতেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই।”
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান বলেন, “দেশের প্রতিটি বয়স্ক নাগরিকদের জন্য সবসময় আমাদের সহানুভূতি এবং সহযোগিতা থাকে। ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া কছির উদ্দিন আকন্দের অবদানকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা যেসব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকি তা মূলত ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর সেনাদের জন্য, অন্য কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, “কছির উদ্দিন আকন্দ যেহেতু ব্রিটিশ সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের সশস্ত্রবাহিনী প্রদত্ত সম্মানী ভাতা পেয়ে আসছেন, তার জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে? তারপরেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার জন্য যা-যা করা সম্ভব, আমি তার সবটুকু করার চেষ্টা করব।”