ভারত গরু রপ্তানি বন্ধ করায় লাভ হয়েছে বাংলাদেশেরই

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী কয়েকদিন আগেই দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশ এখন গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ঈদের পশুর হাটে সত্যিই এবার ভারতীয় গরু নজরে পড়ছে না।

শুক্রবার মন্ত্রী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের জানা মতে একটি ভারতীয় গরুও এবার আসেনি। ভারত থেকে গরু আমদানির কোনো অনুমতি নেই।’’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে ভারতীয় গরু আসা বন্ধ করে দেয়। আর সেটাই হয়েছে বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। এখন বাংলাদেশ গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গরুর মাংস রপ্তানিও শুরু করেছে। এবার কোরবানির ঈদে গবাদি পশুর যে চাহিদা তার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। চাহিদার চেয়ে কোরবানির পশু বেশি।

সরকারি হিসেব বলছে, দেশে এবার দেশে কোরবানির জন্য ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার গরু-ছাগলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু প্রস্তুত আছে এক কোটি ২৫ লাখ ২৪ হাজার।

বিবিএস-এর জরিপ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ যে হিসেব দিয়েছে তাতে দেশে গরু ছাগলের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। গত মাসে তারা কৃষি শুমারির প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশ এখন গরু-ছাগলে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুমারির ফল থেকে জানা যায়, দেশে এখন গরুর সংখ্যা দুই কোটি ৪০ লাখ ১৪ হাজার ১৪৪, ২০০৮ সালে যা ছিল ২ কোটি ৫৭ হাজার ৮৫৩। এক যুগের ব্যবধানে গরু বেড়েছে ৪০ লাখের বেশি। অন্যদিকে দেশে বর্তমানে ছাগলের সংখ্যা এক কোটি ৬২ লাখ ৯৫ হাজার ২০০, যা এক যুগ আগে ছিল এক কোটি এক লাখ ৫৯ হাজার ৫০৯। এক যুগে ছাগল বেড়েছে প্রায় ৬১ লাখ।


আরও পড়ুন- দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে গরু-ছাগলের সংখ্যা


২০২০ সালে বিবিএস এই কৃষি শুমারি পরিচালনা করে, যার প্রাথমিক রিপোর্ট তারা এ বছর প্রকাশ করে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, গত দুই বছরে পশু সম্পদের আরও উন্নতি হয়েছে। গত এক যুগে ভেড়ার উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ। বর্তমানে ভেড়ার সংখ্যা ১৩ লাখ ৪১ হাজার ৬১৯টি। ২০০৮ সালে ছিল চার লাখ ৭৮ হাজার ১৭। মহিষের সংখ্যাও বেড়েছে ৩০%। এখন ছয় লাখ ২৯ হাজার ৬৪০টি মহিষ আছে। ২০০৮ সালে এই সংখ্যা ছিল চার লাখ ৩১ হাজারের মতো।

আর সব মিলিয়ে দুধ দেয় এমন গরু, মহিষ ও ছাগল আছে ১৮ লাখের মতো।

যেভাবে আসে সাফল্য

গাজীপুরের গিয়াসউদ্দিন সরকার ২০১৫ সালে মাত্র একটি গরু দিয়ে শুরু করেন তার গরুর ফার্ম ‘‘সাফ গ্রিন অ্যাগ্রো”। তার খামারে এখন ১৬০টিরও বেশি গরু রয়েছে। তিনি একই সঙ্গে মাংস এবং দুধ উৎপাদন করেন তিনি। প্রতিদিন দুধ পান ৭০০ লিটার।

গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘‘একটি খামার দুই-তিন বছরের মধ্যেই লাভে চলে যায়।”

এইরকম সাফল্যের কাহিনি বাংলাদেশে এখন প্রত্যেক এলাকায়ই পাওয়া যাবে।

তার কথা, ‘‘সরকার যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে এখন ছোট খামারিরাও দুধ এবং মাংস দেশের বাইরে রপ্তানি করতে পারবে।”

২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে সেখান থেকে গরু আসা বন্ধ করে দেয়। আর সেটাই বাংলাদেশের জন্য শাপে বর হয়েছে। চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশে গবাদি পশুর লালনপালন বেড়ে যায়। আর ওই সিদ্ধান্তই বাংলাদেশকে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে।


আরও পড়ুন- বাংলাদেশে একটি গরুর দামে ভারতে কেনা যাচ্ছে দুটি


বাংলাদেশে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে ২০ লাখ খামার আছে। এর আগে প্রতি বছর ভারত থেকে প্রতি বছর ৩০ লাখের মতো গরু-ছাগল আসতো বৈধ এবং অবৈধ পথে। শুধু কোরবানির ঈদেই আসতো ২০-২২ লাখের মতো। মিয়ানমার থেকেও আসতো। ২০১৮ সালেও ভারত থেকে এক লাখ ৫০ হাজার গরু আসে।

কিন্তু এখন চিত্র পুরোই পাল্টে গেছে। উল্টো প্রতি বছর দেশি গরুরই একটি অংশ অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে দুধের উৎপাদনও বেড়ে গেছে তিনগুণ।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা আগে থেকেই ভারতীয় গরু আসার বিপক্ষে ছিলাম। কারণ, ভারতীয় গরুর কারণে খামারিরা দাঁড়াতে পারছিল না। এই অবস্থায় ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হওয়ার পর আমরা গবাদি পশু লালন-পালনের প্রশিক্ষণের ব্যাপক উদ্যোগ নিই। আর এটা আমরা করি অনলাইনে। এর ফলে দেশে এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত তরুণরা ব্যাপক আগ্রহী হয়ে ওঠেন। দেশে তো বটেই বিদেশে পড়াশুনা শেষ করে অনেক শিক্ষিত তরুণ গরুর খামার প্রতিষ্ঠা করে। তাদের এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ের সাধারণ মানুষকেও উৎসাহী করে। ফলে রীতিমতো একটা বিপ্লব হয় এই সেক্টরে।’’

কোরবানির হাটে এবার গরুর অভাব ছিল না /মেহেদি হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

তিনি আরও বলেন, এখন আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো গরু, তথা মাংসের দাম কমিয়ে আনা। সরকারের কিছু নীতি সংশোধন কললেই এই দাম কমে আসবে। বিশেষ করে পশু খাদ্যের আমদানি নীতিতে পরিবর্তন দরকার। আর দরকার অ্যামেরিকা ও ইউরোপের কিছু গরুর ক্রস ব্রিডিংয়ের অনুমতি। এখন আমরা অনেকটাই অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিজিয়ান জাতের ওপর নির্ভরশীল। আর ছাগলের ক্ষেত্রে আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি ব্ল্যাক বেঙ্গল গোটের ওপর। কিন্তু আমরা চাই আফ্রিকার কিছু ছাগল, যা দ্রুত বাড়ে তার অনুমতি দেওয়া হোক।’’ ৱ

একই সঙ্গে সরকারের ঋণ ও নীতি সহায়তার কথাও বলেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ননী গোপাল দাস বলেন, ‘‘এখানে বিদেশ থেকে উন্নত জাতের গরু এনে ক্রস ব্রিডিংয়ের সুবিধা দেওয়ায় এই খাতটি দ্রুত এগিয়ে যায়। আর বাংলাদেশে মাংসের বিশাল একটি বাজার আছে। ফলে খামারিরা সহজেই লাভ করতে পারেন। এখানকার পরিবেশ এবং সরকারের নীতি সহায়ক হওয়ায় দ্রুতই গবাদি পশুর উৎপাদন বেড়ে যায়।’’

তিনি বলেন, ‘‘সবচেয়ে বড় কথা হলো এই খাতে তরুণরা এগিয়ে এসেছেন। তারা পথপ্রর্দশকের কাজ করেছেন। এখন বড় বড় বিনিয়োগকারী এই খাতে বিনিয়োগ করছেন।’’

গত সাত-আট বছরের মধ্যে বাংলাদেশে গবাদি পশু উৎপাদনের এই বৈপ্লবিক সাফল্যের জন্য মৎস ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রী শ. ম রেজাউল করিম বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরই কৃতিত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘‘যারা এগিয়ে এসেছেন তাদের আমরা স্বল্প সুদে ঋণ দিয়েছি। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। চিকিৎসা এবং ঔষধ সহজলভ্য করেছি। পশু খাদ্য আমদানি সহজ করেছি। আর বিদেশ থেকে উন্নত জাতের গরু এনে কৃত্রিম প্রজনের ব্যবস্থা করেছি।’’

তার কথা, ‘‘এবার ভারত থেকে আমরা একটি গরুও আমদানি করতে দেইনি। এখন আমদানি বন্ধ আছে। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হবে বলে মনে করি না।’’

গরুর মাংস রপ্তানি

শ. ম রেজাউল করিম জানান, বালাদেশ থেকে এরইমধ্যে বেঙ্গল মিটসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশে হিমায়িত গরুর মাংস রপ্তানি শুরু করেছে।

বিশ্বের ৩০টি দেশে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের গরুর মাংসের চাহিদার কথা জানা গেছে।

তিনি বলেন, ‘‘এখানে কিছু টেকনিক্যাল বিষয় আছে সেগুলোর সমাধান করে আমরা গরুর মাংস রপ্তানি বাড়াতে চাই। আমাদের প্রস্তুতি চলছে। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অচিরেই রপ্তানি শুরু করবে।”

মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ এখন আর বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানি করে না। কিছু ভেড়ার মাংস আমদানি করা হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এখন বছরে গরুর মাংসের চাহিদা ৭০ লাখ টন।