টিকে থাকার লড়াইয়ে কয়রার মানুষ আবারও হতাশায় ডুবলেন। ১৬ আগস্ট সকাল ৭টা থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামত শুরু করেন দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার মানুষ। কিন্তু এ কাজ চলাকালেই ২০০ মিটার দূরে আরও ৪০ মিটার জায়গা ভেঙে যায়। ফলে স্বেচ্ছাসেবকরা হতাশ হয়ে উঠে আসেন।
এলাকাবাসী জানান, নদী ভাঙনে ঘর-বাড়ি, জমি-জমা সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ১০ গ্রামের অনেক পরিবার। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ওই ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। ঘর-বাড়ি হারিয়ে ছেলে-মেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। ভেসে গেছে প্রায় তিন হাজার বিঘা চিংড়ি ঘের। ডুবে গেছে আমনের বীজতলা। ১৫ আগস্ট সকালে এলাকাবাসী বাঁধ বাধার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। দুপুরের জোয়ারে পুনরায় পানি প্রবেশ করে।
খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার জিএম মাহবুবুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বাঁশ ও ব্যাগ স্বল্পতায় কাজে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড যে সরঞ্জামাদি দিয়েছিল সেটা যথেষ্ট ছিল না। যথেষ্ট মানুষ থাকার পরেও বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করতে পারিনি।”
বাঁধের ৪০ মিটার জায়গা ভেঙে যায়/ ঢাকা ট্রিবিউনদক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের আক্তারুল ইসলাম বলেন, “নদী ভাঙনের কারণে আমার ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথায় থাকবো জানি না। রান্না করার কোনো ব্যবস্থা নেই। বাঁধ না হলে ছেলে মেয়ে নিয়ে কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। সে কারণে সব কিছু ফেলে বাঁধ বাঁধার কাজে নেমে পড়েছি।”
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য (ইউপি) সদস্য মো. মাসুদ রানা বলেন, “পানিতে তলিয়ে গেছে দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ১০ গ্রাম। ক্রমাগত ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চরম গাফিলতি রয়েছে।”
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, “একই স্থানে বারবার ভাঙা দুঃখজনক। কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই এই ভোগান্তি। সরকার ইতোমধ্যে ওই এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দ্রুত স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জনমনে স্বস্তি নেই। কারণ আমরা দেখেছি বিগত ১০ বছরে জরুরী কাজের নামে কয়রার বেড়ীবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ১৪২ কোটি ৫৮ লাখ ৮ হাজার টাকারও বেশি। অথচ সেইসব জোড়াতালিতেও লুটপাট বাঁধ সংস্কারের নামে যেটুকু কাজ হয়, সেখানেও রয়েছে আমলা, কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার মিলিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের লুটপাট।”
তিনি আরও বলেন, “টেন্ডারে কাজ পেয়ে মূল ঠিকাদার নিজের লাভটা রেখে কাজটা বিক্রি করে দেন আরেকজনের কাছে। এভাবে হাতবদল হলে কাজের মান খারাপ হতে বাধ্য, এটাই দেখে এসেছি এতদিন। এবার আর এমনটি চাই না।”
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়নের বোর্ডের (বিভাগ-২) উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পুর) মো. মশিউল আবেদিন ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রাথমিকভাবে ভেঙে যাওয়া রিংবাঁধ মেরামতের মাধ্যমে পানি আটকানোর জন্য মানুষ কাজ শুরু করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষে বস্তা ও বাঁশ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়। পানি আটকানোর পর মূল ক্লোজারে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাঁধ আটকানোর আগেই আরেকটি ভাঙন সব শেষ করে দিল।”