কেরানীগঞ্জ থেকে গত ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় থেকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মায়ের বাসায় যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য দুরন্ত বিপ্লব (৫১)।
এরপর শনিবার (১২ নভেম্বর) বিকেলে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বুড়িগঙ্গা নদী থেকে একটি লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা সেটিকে দুরন্ত বিপ্লবের লাশ বলে শনাক্ত করে।
এদিকে, রবিবার নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসক মফিজুল উদ্দিন প্রধান সাংবাদিকদের জানান, দুরন্ত বিপ্লবকে মাথায় ও বুকে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “ধারণা করা হচ্ছে, সমান কোনো বস্তু দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়েছে। বুকে ও মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুরন্ত বিপ্লবকে হত্যা করা হয়েছে।”
বিপ্লপের পরিবারেরও ধারণা তাকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ ও নৌ পুলিশ ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য প্রদান করায় তার মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
দুরন্ত বিপ্লবের মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান যেখানে শনাক্ত হয়েছে, তার কাছাকাছি স্থান থেকেই তার মরদেহ উদ্ধার করে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ।
এদিকে ঘটনার দিন সেখানেই নদীতে নৌকা থেকে একজনের পড়ে যাওয়ার কথা জেনেছে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ। তবে বুড়িগঙ্গায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকারী নৌ পুলিশ বলছে, ৭ নভেম্বর এ রকম কোনো ঘটনা তাদের জানা নেই।
দুই যুগ আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দুরন্ত বিপ্লব। রাজনীতিতে এখন আগের মতো সক্রিয় না থাকলেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি ও সমবায় বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।
দুরন্ত কয়েক বছর ধরে কেরানীগঞ্জের বাস্তা এলাকায় সোনামাটি অ্যাগ্রো ফার্ম নামে একটি কৃষি খামার চালাচ্ছিলেন।
দুরন্ত বিপ্লবের পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় বসবাস করেন। গত ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জ থেকে মোহাম্মদপুরে মায়ের বাসায় যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন। কোথাও খোঁজ না পেয়ে দুদিন পর ৯ নভেম্বর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে পরিবার।
ওই এলাকার অনেকেই ঢাকায় আসতে বুড়িগঙ্গা নদীতে খেয়া পার হন। কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা এলাকা থেকে নৌকায় উঠে সোয়ারীঘাটে এলে অনেকটা পথ যানজট এড়ানো যায়। দুরন্ত বিপ্লবও ওই পথটিও ব্যবহার করতেন।
দুরন্তের ভগ্নিপতি ইমরুল খান বলছেন, “ওর মোবাইল ফোনের সর্বশেষ লোকেশন পাওয়া যায় কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ এলাকায়।”
কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ এলাকাটি বুড়িগঙ্গা নদীর জিঞ্জিরা ও সোয়ারীঘাটের মাঝ বরাবর খানিকটা দূরের স্থলভূমি, যে স্থানে নদী ভাগ হয়ে দুই পাশ দিয়ে বয়েছে। বুড়িগঙ্গার এই অংশটা দিয়ে ঘাট পারপারের খেয়া নৌকাগুলো চলাচল করে।
দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানার ওসি শাহজামান বলেন, "দুরন্ত বিপ্লবের মোবাইল ফোন লোকেশন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেই জায়গায় দুর্ঘটনাটির কথা বলা হয়েছে, ৭ নভেম্বর দুরন্ত বিপ্লবের সর্বশেষ অবস্থান সেখানে ছিল।”
নৌকা থেকে একজনের পড়ে যাওয়ার খবর জানালেও তিনি বলেন, "তবে নৌকা থেকে পড়ে যাওয়া ব্যক্তিই যে দুরন্ত বিপ্লব, আমরা এখনো সে কথা বলছি না। আমাদের তদন্ত চলছে।”
পুলিশের বক্তব্য মানতে নারাজ নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের বরিশুর ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ এসআই নকীব ওয়ায়েজুল হক।
তিনি বলেন, "আমরা কিন্তু এমন কোনো খবর পাইনি। এখানে এমন কোনো ঘটনা ঘটলে আমাদের কাছে কোনো না কোনোভাবে খবর আসে। তাছাড়া আমরা নদী এলাকায় নিয়মিত টহলও দিই।”
দুরন্তের ছোট ভাই দুর্জয় বিপ্লব জানান, চার বছর আগে তার ভাই চার বন্ধুর সঙ্গে মিলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি কৃষি খামার করেছিলেন।
কী কারণে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। এখন পুলিশের কাজ কারা, কেন, কী কারণে ভাইকে হত্যা করেছে, তা খুঁজে বের করা।”