সাম্প্রতিক সময়ে দেশে তালাকের সংখ্যা বেড়েছে। আর তালাকের দিকে এগিয়ে আছে রাজধানী ঢাকা। গত এক বছরে দেশে তালাকের হার বেড়ে ১.৪% হয়েছে, যা আগে ছিল ০.৭%। এ সময়ে ঢাকায় গড়ে প্রতিটি তালাক হয়েছে ৪০ মিনিটের ব্যবধানে।
মঙ্গলবার (১৩ জুন) ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ভবনে বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ২০২২-এর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিবিএস ডিজি (চলতি দায়িত্ব) পরিমল চন্দ্র বসুর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম ও পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. আলমগীর হোসেন। তিনি জানান, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে তালাকের হার বেড়েছে। শহরের চেয়ে পল্লী এলাকায় এই স্থুল তালাকের হার বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, দেশে বর্তমানে তালাকের হার ১.৪%। ২০২১ সালে এ হার ছিল ০.৭%। এ তালাকের হার পল্লী এলাকায় ০.৮% থেকে বেড়ে ১.৪% হয়েছে। অন্যদিকে, শহর এলাকায় তালাকের হার ০.৫% থেকে বেড়ে হয়েছে ১%।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মোট ১৩,২৮৮টি তালাকের আবেদন এসেছিল। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে তালাকের আবেদন সংখ্যা ৭,৬৯৮টি। পক্ষান্তরে, উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৫,৫৯০টি তালাকের আবেদন পড়েছে। ফলে প্রতিদিন ঢাকায় ৩৭টি সংসার ভেঙে যাচ্ছে।
বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এখনও ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসরণ করা হয়। এ আইন অনুযায়ী, ঢাকায় দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে তালাকের আবেদন পাঠাতে হয়। মূলত স্ত্রীর অবস্থানের ঠিকানায় থেকে আবেদনটি ওই অঞ্চলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এরপর ঢাকায় দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে আবেদন নথিবদ্ধ হয়।
বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়লে কর্তৃপক্ষ আবেদনকারী ও বিবাদী- দুই পক্ষকেই আপসের নোটিশ পাঠায়। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারাই এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। কারণ তারাই দুই পক্ষের কাছে আপসের নোটিশ পাঠান। দুই পক্ষে সমঝোতা না হলে কর্তৃপক্ষের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না। আবেদনের তিন মাসের (৯০ দিন) মধ্যে কোনো পক্ষ আপস না করলে কিংবা আবেদন তুলে না নিলে আইনত তালাক কার্যকর হয়ে যায়।
সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে তালাকের আবেদন করেন। স্ত্রী বা স্বামী- কার আবেদনের নোটিশে সাধারণত অপর পক্ষ আসে না। দুই পক্ষ কখনো এলেও আপসের মতো পরিস্থিতি থাকে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়ে যায়।
তালাকের আবেদনের ছক আইনজীবীদের কাছে একরকম প্রস্তুতই থাকে। পরিবর্তন বলতে শুধু বিভিন্ন পক্ষের নাম-পরিচয়-ঠিকানাই ভিন্ন। হঠাৎ দুই-একটি ক্ষেত্রে সামান্য ভিন্ন হলেও বাকি সব একই। সিটি কর্পোরেশনের আবেদনগুলোতে তাই বিবাহবিচ্ছেদের জন্য দেখানো কারণগুলোও ঘুরেফিরে একই।
প্রায় সব আবেদনেই বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া। এর বাইরে অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক কলহ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, যৌতুক, মাদক সেবন করে নির্যাতন, প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, যৌন অক্ষমতা, সন্দেহ, উদাসীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাতসহ আরও কিছু অভিযোগ।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারীরাই তালাকের আবেদন করার দিক থেকে এগিয়ে আছেন। প্রতি ১০টি আবেদনের প্রায় সাতটি এসেছে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে। ২০২২ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আসা তালাকের আবেদনের ৭০% স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এসেছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে সেটি ৬৫%।