Wednesday, September 09, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

১৮ বছরের আগেই রাজশাহী বিভাগে ৬৭ শতাংশ মেয়ের বিয়ে

১৫ বছরের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসছে ১৩ শতাংশ কন্যাশিশু

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৪ এএম

রাজশাহী বিভাগে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ৬৭ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৫ বছরের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসছে ১৩ শতাংশ কন্যাশিশু। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রমে ভাটা এবং অর্থসংকটের কারণে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে ১৮ বছরের আগেই ৬৭ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। শহরাঞ্চলে এ হার ৫০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৫৬ শতাংশ। একই জরিপে দেখা গেছে, ১৫ বছরের আগেই বিয়ে হচ্ছে ১৩ শতাংশ শিশুর। পাশাপাশি অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের কারণে বিয়ে-বিচ্ছেদ ও পারিবারিক কলহও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিবিএসের আরেক তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের ৬৫ দশমিক ০৭ শতাংশ বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। তাদের মধ্যে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর হার ৭ দশমিক ১২ শতাংশ।

রাজশাহীর চরাঞ্চলে বাল্যবিয়ের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। পদ্মা নদীর চর মাঝাড়দিয়াড় এলাকায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর অনেক মেয়েকেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকেরা। স্থানীয়দের ভাষ্য, উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকায় মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়াকেই তারা নিরাপদ মনে করছেন।

চর নবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. এমদাদুল হক বলেন, “অভিভাবকেরাই মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেন। উচ্চশিক্ষার জন্য এসএসসি পর্যায়ের স্কুল বা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ প্রয়োজন হলেও চর এলাকায় সে সুযোগ নেই।”

বাল্যবিয়ের প্রকৃত হার বিবিএসের পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন ব্লাস্ট রাজশাহীর সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট সামিনা বেগম। তার মতে, অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ের ক্ষেত্রে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তার কাজের অভিজ্ঞতায় বিয়ে-বিচ্ছেদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, সচেতনতা ও আইন প্রয়োগে জেলা-উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই বছরে ইউনিয়ন পরিষদের নেতৃত্বে শূন্যতা এবং বিভিন্ন এনজিওর প্রকল্প ও বরাদ্দ কমে যাওয়ায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতা কার্যক্রমও কমেছে। সরকারি দপ্তরগুলোর বাল্যবিবাহ নিরোধ কমিটিগুলো অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাদের কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান নয়।

দুস্থ মহিলা কল্যাণ সমিতির পরিচালক ও বিভাগীয় জয়ীতা রহিমা বেগম বলেন, “বাল্যবিবাহ নিরোধ কমিটি থাকার কথা জানা গেলেও অনেক কমিটির কার্যক্রম সক্রিয় নয়। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, সচিব ও গ্রাম পুলিশকে নিয়ে একাধিকবার সভা করা হলেও কার্যকর পরিবর্তন সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে না।”

ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তারাও বলছেন, প্রকল্প ও বাজেট সংকটের কারণে উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম আগের তুলনায় কমেছে। পবা উপজেলার হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, “উঠান বৈঠক ও স্থানীয়দের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করতে অর্থের প্রয়োজন হলেও এর জন্য আলাদা বাজেট নেই। নিজেদের অর্থায়নে যতটা সম্ভব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।”

পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজাদ আলী বলেন, “বাল্যবিয়ে বন্ধে আলাদা কোনো বাজেট নেই। তবে কোথাও বাল্যবিয়ের খবর পাওয়া গেলে দ্রুত তা বন্ধের চেষ্টা করা হয়।”

উন্নয়ন সংস্থাগুলোও বলছে, অর্থায়ন কমে যাওয়ায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের কাজ সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের আগে রাজশাহী অঞ্চলে বাল্যবিয়ে, আইনি সহায়তা ও বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে অর্ধশতাধিক বেসরকারি সংস্থা কাজ করলেও প্রকল্প ও অর্থসংকটে তাদের অনেকের কার্যক্রম কমে গেছে।

রাজশাহী ইইউডিএসের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক তাসবীর আহমদ খান বলেন, “বিভিন্ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। ২০১৯ ও ২০২২ সালের পর বিভিন্ন প্রকল্প ও ডোনার ফান্ডিং কমে যাওয়ায় এসব কার্যক্রমও কমেছে।”

রাজশাহী লফসের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, “ধীরে ধীরে কর্মসূচিগুলো ছোট হয়ে আসছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সরাসরি তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত কাজ করা কঠিন। ছোট সংগঠনগুলোর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কাজ পরিচালিত হলেও ফান্ডিং কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে।”

উন্নয়নকর্মী সুব্রত কুমার পাল বলেন, “অর্থসংকটের কারণে অনেক এনজিও বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে আছে, তারাও কার্যক্রম সীমিত করেছে। ফলে বাল্যবিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ছে।”

রাজশাহীর উন্নয়ন সংস্থা পরিবর্তনের পরিচালক রাশেদ রিপন বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের এলাকায় বাল্যবিয়ে বন্ধের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নিলে অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। শুধু আইন প্রয়োগ করে বাল্যবিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়; এর জন্য সামাজিক আন্দোলন ও মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি।”

এদিকে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে একটি বাল্যবিয়ে পড়ানোর অভিযোগে এক ইমামকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই ঘটনায় বরকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার কাকনহাট পৌরসভার দরগাপাড়া গ্রামে এ অভিযান পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান।

ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, দরগাপাড়া গ্রামের ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীর সঙ্গে নারায়ণপুর গ্রামের তরিকুল ইসলামের ছেলে জাকির হোসেনের (২৩) বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। বিয়ে পড়ানোর অভিযোগে স্থানীয় মসজিদের ইমাম আব্দুর রাজ্জাককে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী ২৫ হাজার টাকা এবং বর জাকির হোসেনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতি টের পেয়ে বর ও কনে পক্ষের লোকজন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পরে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাল্যবিয়ে বন্ধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

   

About

Popular Links

x