বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং বাংলাদেশের মাটিতে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি লিখেছেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সুইডিশ বিচারপতি সৈয়দ আসিফ শাহকার।
সোমবার (১২ ডিসেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, সৈয়দ আসিফ শাহকার এই চিঠি লিখেছিলেন আরও প্রায় আট বছর আগে। ২০১৪ সালে লেখা চিঠির বিষয়ে কোনো সাড়া পাননি তিনি। এবার তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লিখেছেন। যেখানে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের সরকার ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি শাহকারকে “মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা” দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা বাসসকে চিঠির বিষয়ে বিচারপতি সৈয়দ আসিফ বলেছেন, “আমার বয়স ৭২ বছর। আমি জানি না, আমি আর কত দিন বাঁচবো। কিন্তু বাংলাদেশের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমি বাংলাদেশের মাটিতেই সমাধিস্থ হতে চাই। বাংলাদেশের নাগরিক না হলে যেহেতু সেখানে সমাধিস্থ হতে পারবো না, তাই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চেয়ে আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি চিঠি লিখেছি।”
কে এই আসিফ শাহকার?
সৈয়দ আসিফ শাহকার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত একজন সুইডিশ নাগরিক। তিনি ২০১৭ সালে সুইডিশ হাইকোর্ট বিভাগ থেকে বিচারপতি হিসেবে অবসর নিয়েছেন। স্টকহোমের বাসিন্দা বিচারপতি শাহকার আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে দেখা করতে এই মুহূর্তে পাকিস্তানের লাহোরে রয়েছেন।
লাহোর থেকে টেলিফোনে শাহকার বিবিসি বাংলাকে জানান, সত্তরের দশকের তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপের এক অংশ যা ন্যাপ মোজাফফর নামে পরিচিত ছিল, তার সাথে যুক্ত ছিলেন।
১৯৪৯ সালে পাঞ্জাবের হরপ্পায় জন্ম নেওয়া এই সুইডিশ বিচারপতি ছাত্রাবস্থায় ১৯৭১ সালে পাঞ্জাব স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
১৯৭১সালের ২৫শে মার্চে “অপারেশন সার্চলাইট” নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা চালালে এর প্রতিবাদ করেন তিনি। এই প্রতিবাদের কারণে তাকে সেসময় গ্রেপ্তার করা হয়। এক বছরের বেশি সময় জেলে কাটিয়ে ১৯৭২ সালে মুক্তি পান তিনি। জেলখানা থেকে ছাড়া পেলেও নিজ দেশ পাকিস্তানে তিনি বিশ্বাসঘাতকের উপাধি পান এবং প্রবল ঘৃণার শিকার হতে থাকেন।
একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে ১৯৭৭ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে সুইডেনে চলে যান তিনি। সুইডেনে আইন বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করে আইন পেশায় যুক্ত হন। একই সময়ে তিনি মানবাধিকার এবং গণহত্যা ইস্যুতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।
বিচারপতি শাহকারের স্ত্রীও একজন সুইডিশ আইনজীবী। তাদের তিন সন্তান রয়েছে।
বিচারপতি শাহকার “১৯৭১” সালকৈ কেন্দ্র করে সুইডেনেও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে থাকেন। সুইডেনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাকে পাকিস্তানি হিসেবে ১৯৭১ সালের জন্য ঘৃণা করছে।
তিনি বলেন, “আমি তাদের (সুইডেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের) বোঝাতেই পারছিলাম না আমি বাংলাদেশের জন্য জেল খেটেছি এবং বাংলাদেশের পক্ষ নেওয়ায় আমার নিজের দেশে আমি কী পরিমাণ অপমান, নির্যাতন এবং যন্ত্রণার শিকার হয়েছি।”
এরপর ২০০০ সালে সুইডেনে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে তিনি প্রথমবার সেখানকার বাংলাদেশিদের মুখোমুখি হয়ে তাদের ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। সে বছরই তিনি বাংলাদেশে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০১ সালে বাংলাদেশে চারদলীয় জোটের অধীনে নতুন সরকার আসার পর তার সে চেষ্টা থেমে যায়।
বিচারপতি শাহকার জানান, এরপর ২০১০ সালে তিনি নতুন করে সুইডেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ২০১২ সালে ১৯৭১ সালে তার ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে “ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার” সম্মাননা দেয় বাংলাদেশের সরকার। তিনি মানসিকভাবে সবসময় বাংলাদেশকে পছন্দ করেন। এ কারণে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও এই দেশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছে তার।
তিনি সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, “আমি বাংলাদেশে টুরিস্ট ভিসা নিয়ে যেতে চাই না, আমি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চাই, কারণ আমি অন্তর থেকে অনুভব করি পাকিস্তান আমার দেশ না। বাংলাদেশই আমার দেশ। আমি বাংলাদেশে বসবাস করতে চাই।”