ফোর্বসের অনূর্ধ্ব ৩০ এশিয়া তালিকায় যে সাত বাংলাদেশি

বিশ্ব খ্যাত সাময়িকী ফোর্বস ২০২৩ সালে বিভিন্ন খাতে ৩০ বছরের কম বয়সী শীর্ষ ৩০ তরুণের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে। যেখানে সৃজনশীল ধারণা ও সেটিকে বাস্তবায়ন করে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের সাত তরুণ। এরমধ্য দিয়ে বৈশ্বিকভাবে তাদের কর্মকাণ্ড স্বীকৃতি পেলো।

চারটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করা সাত তরুণ বাংলাদেশিসহ এশিয়ার অন্য ৩০ জনের তালিকা বৃহস্পতিবার (১৮ মে) প্রকাশ করেছে সাময়িকীটি। ১০ বিভাগের প্রতিটির জন্য ৩০ জন করে ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাদের সবার বয়স ত্রিশের নিচে।

যেসব বাংলাদেশি তালিকায় এ বছরের জায়গা করে নিয়েছেন। তারা হলেন- কনিজিউমার টেকনোলজিতে আজিজ রহমান ও দীপ্ত সাহা। মিডিয়া, মার্কেটিং অ্যান্ড অ্যাডভারটাইজিং বিভাগে রুবাইয়াত ফারহান ও তাসফিয়া তাসবিন। সোশ্যাল ইমপ্যাক্টে জাহ্নবী রহমান, আনওয়ার সায়েফ এবং সারাবান তহুরা।

২০১৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত মোট ৩২ জন বাংলাদেশি এ তালিকায় উঠে আসেন। ২০২১ সালে সর্বোচ্চ নয়জন বাংলাদেশি এ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। ২০২২ সালে পেয়েছিলেন সাতজন।

যাত্রী: যাত্রী”র সহপ্রতিষ্ঠাতা আজিজ আরমান। বাংলাদেশের বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থায় জনগণের চলালের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ করছে তার প্রতিষ্ঠিত “যাত্রী”। যাত্রীদের জন্য নায্য ভাড়া নিশ্চিতে ২০২২ সালে ঢাকা বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন তার স্ট্যার্টআপের মাধ্যমে ৫,৬৫০টি পাবলিক বাসের জন্য ই-টিকিটিং সিস্টেম চালু করতে সম্মত হয়। এ ছাড়া স্টার্টআপটি ভাড়ায় গাড়ির পরিষেবা দিয়ে থাকে।

২০২১ সালে ফার্মটি রিফ্লেক্ট ভেঞ্চারস, ব্রেন-টু-ফ্রি ভেঞ্চারস এবং এসবিকে টেক ভেঞ্চারসহ বিভিন্ন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১.২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মোট তহবিল প্রায় ৫.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

অ্যাগ্রোশিফট টেকনোলজিস: অ্যাগ্রোশিফট টেকনোলজিস হলো একটি কৃষিভিত্তিক সাপ্লাই চেইন প্ল্যাটফর্ম। যেখানে ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য পেতে সহায়তা করে। অ্যাগ্রোশিফ্ট সরাসরি কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করার কারণে গার্মেস্ট শ্রমিকদের কাছে কম দামে টাটকা সবজি সরবরাহ করতে পারে। প্ল্যাটফর্মটি সম্প্রতি রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) গ্লোবাল ইনোভেশন চ্যালেঞ্জের জন্য এইচঅ্যান্ডএম এর স্টিচ জিতেছে এবং শরুক পার্টনার্স এবং অ্যাংকরলেস বাংলাদেশের নেতৃত্বে একটি প্রি-সিড রাউন্ডে ১.৮ মিলিয়ন ডলার অর্জন করেছে।

এক প্রতিক্রিয়ায় সহ প্রতিষ্ঠাতা দীপা সাহা বলেন, “এটি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি আঞ্চলিক এবং পরবর্তীতে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সামনে তুলে ধরবে।  এটা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার।”

তিনি বলেন, “আপনি যদি ফোর্বসের মতো একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে যান, এই গল্পগুলো বলার সুযোগ থাকবে, বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ থাকবে। সেই গল্প বলার অপেক্ষায়!”

মার্কপোলো ডট এআই: মার্কোপলো ডট এআই দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিপণন করে থাকে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সহজেই সামাজিক মাধ্যমে বিপণণ করা সম্ভব হচ্ছে। সে লক্ষ্যে তাদের একটি অ্যাপ আছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো তা অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করতে পারে। এই অ্যাপ মেশিন লার্নিং মডেলের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে তারা বিশাল তথ্যভান্ডার তৈরি করেছে। গণমাধ্যম, বিপণন, বিজ্ঞাপন শ্রেণিতে তারা তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি সিঙ্গাপুরের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম একক্সেলেটারিং এশিয়ার নেতৃত্বে এ রাউন্ডে ৭০০,০০০ ডলার পেয়েছে।

রিল্যাক্সি: রিল্যাক্সির সহ-প্রতিষ্ঠা জাহ্নবী রহমান। এটি একটি প্রযুক্তি-ভিত্তিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম। যেটি বাংলাদেশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার বিষয়ে কাজ করছে। মানসিক স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত সমস্যায় ভুগছেন এমন তরুণদের ডিজিটালি সমাধান প্রদান করে থাকে রিলাক্সি। পাশাপাশি রিল্যাক্সি বেশ কয়েকটি বিনামূল্যের পরিষেবা প্রদান করে থাকে। যেমন, মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মেডিটেশন এবং কম খরচে ভার্চুয়াল থেরাপি সেশন। হুয়াওয়ের আইসিটি ইনকিউবেটরে ২০২২ সালের দ্বিতীয় রানার-আপ হিসেবে নির্বাচিত হয়ে প্ল্যাটফর্মটি। বর্তমানে এটির ১৫  হাজারেরও বেশি ব্যবহারকারী রয়েছেন।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সাবেক ছাত্রী জাহ্নবী ২০২১ সালের শেষ অবধি বেশ কয়েক বছর ধরে বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। তখন তিনি রিলাক্সি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বিনামূল্যে সেশন দিত করতে শুরু করেছিলেন। এই বিশ্বাসের সাথে যে কাউকে এই ধরনের কষ্ট সহ্য করতে হবে না।

তিনি বলেন, “আমরা যারা অবিরাম সংগ্রাম করি, আমরা যারা মানসিকভাবে স্থির নই। তাদের একটি নিরাপদ জায়গা প্রয়োজন।”

২০২২ সালের জুলাইয়ে রিল্যাক্সি কাজ শুরু করে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১,৭০০ মানুষ রিল্যাক্সির সেবা নিয়েছেন। এছাড়া ৫,০০০ এর মতো বেনামি বার্তা পেয়েছেন তারা।

টার্টল ভেঞ্চার স্টুডিও: সারাবন তহুরা তুরিন এবং আনোয়ার সায়েফ অনিক প্রতিষ্ঠিত 'টার্টল ভেঞ্চার স্টুডিও”র লক্ষ্য- অর্থায়ন, পরামর্শদান, গ্লোবাল নেটওয়ার্কে অ্যাক্সেস এবং কারিগরি সহায়তার মতো সেবা দিয়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের উঠিয়ে আনা। এটি দেশের প্রথম ভেঞ্চার স্টুডিও।

প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সাল থেকে নব্বইয়ের বেশি উদ্যোক্তার সঙ্গে কাজ করেছে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তাদেরকে ১৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল সংগ্রহ করতে সহায়তা করেছে। প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি, প্ল্যাটফর্মটি শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করার জন্য 'ইয়ং টার্টল' নামক একটি প্রোগ্রামও চালু করেছে “টার্টল ভেঞ্চার”।

তিনি লিখেন, “নিদ্রাহীন রাত থেকে ফোর্বসের ৩০ অনূর্ধ্ব ৩০ এশিয়া পর্যন্ত। দৃঢ়তা, আবেগ, এবং নিরলস সাধনার একটি যাত্রা।  এই অঞ্চলের উজ্জ্বল তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্বীকৃত হতে পেরে সম্মানিত।  এটি একটি অসাধারণ গল্পের শুরু মাত্র।”

আগেও যারা এসেছিলেন ফোর্বসের তালিকায়

২০২২ সালে সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন- শাহ রাফায়াত চৌধুরী এবং মোহাম্মদ তাকি ইয়াসির, ফুটস্টেপসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা;  শাটলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রেয়াসাত চৌধুরী এবং জাওয়াদ জাহাঙ্গীর;  জাফির শফি চৌধুরী এবং মীর শাহরুখ ইসলাম, বন্ডস্টেইন টেকনোলজির সহ-প্রতিষ্ঠাতা;  এবং এলিস ল্যাবসের প্রতিষ্ঠাতা শুভ রহমান।

২০২১ সালে, ফোর্বস নয়জন বাংলাদেশিকে তালিকাভুক্ত করেছে।

তারা হলেন- গেজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শেহজাদ নূর তাউস প্রিয় এবং মোতাসিম বীর রহমান; ক্র্যামস্ট্যাকের প্রতিষ্ঠাতা মীর সাকিব;  আ্যাওয়ারনেম ৩৬০-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা শমী চৌধুরী এবং রিজভে আরেফিন; অভিজাত্রিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ ইমতিয়াজ জামি; হাইড্রোকিউ+ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিজভানা হৃদিতা ও মো. জাহিন রোহান রাজিন; এবং পিকাবুর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মরিন তালুকদার।

এর আগে পাঠাও-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুসেন ইলিয়াস এবং কার্টুনিস্ট মোর্শেদ আবদুল্লাহ আল ২০১৯ সালে চতুর্থ বছরে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিলেন।  ইলিয়াসকে দুটি ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল - কনজিউমার টেকনোলজি এবং বিগ মানি স্টার্টআপস, আর মোর্শেদকে মিডিয়া, মার্কেটিং এবং অ্যাডভারটাইজিং ক্যাটাগরিতে নাম দেওয়া হয়েছিল।

ফোর্বসে বাংলাদেশিরা

২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফোর্বসের ১৯তম বার্ষিক ১০০ জন ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় ৪২তম স্থানে ছিলেন।

২০২১ সালে, তার পদমর্যাদা ছিল ৪৩। শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদী প্রধানমন্ত্রী, বর্তমানে তার চতুর্থ মেয়াদ ও তার টানা তৃতীয় মেয়াদ অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন।

সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান, মুহাম্মদ আজিজ খান ২০২২ সালের জন্য ফোর্বসের তালিকায় সিঙ্গাপুরের ৪২তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তার মোট সম্পদ ১ বিলিয়ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।