২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দলীয় জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হয়েছিলেন প্রায় চারশ” মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৪ জনের অবস্থা ছিল গুরুতর। এ ঘটনার পরপরই বিষয়টি ভিন্ন খাতে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন সরকার। ভুয়া আসামি বানিয়ে আসল দায়ীদের বাঁচানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল। এরমধ্যে জজ মিয়া নামে একজনকে আসামি সাজিয়ে গল্প তৈরি করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এ ঘটনায় বিচার করে।
জজ মিয়া কে ছিলেন?
২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে জজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় এনে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তারা দাবি করেন, তিনিই এই হামলার হোতা। মূলত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাকে এই মামলায় ফাঁসায়।
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নির্দেশে ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) কর্মকর্তারা তদন্তকে ভিন্ন পথে চালিত করতে জজ মিয়ার গল্প তৈরি করেন।
ফলে যে যুবক জীবনে গ্রেনেড দেখেনি, ২০০৫ সালের জুন মাসে সেই একটি মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেয়। জানায়, সুব্রত বাইন শুভ্রর নেতৃত্বে সেভেন-স্টার গ্রুপ নামে একটি আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাং গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল।
যদিও মামলার তদন্তে জানা যায়, এই প্রাণঘাতী হামলার সাথে জজ মিয়া এবং সেভেন স্টার গ্রুপের কোনো সম্পর্ক ছিল না। প্রকৃতপক্ষে জঙ্গি গোষ্ঠী হুজি, তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতারাই এই ঘটনা ঘটান।
জজ মিয়া এখন কোথায়?
জজ মিয়া ওরফে জালাল এখন ঢাকায় প্রাইভেটকার চালান। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সিআইডি কর্মকর্তাদের নির্যাতনের বিবরণ দেন আদালতে। তিনি সেখানে বিশদ বিবরণ দিয়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলার ঘটনায় কীভাবে তার স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে তা জানান।
তিনি বলেন, হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় তাকে মূল আসামি দেখানোর জন্য সিআইডির শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে অনেক মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, “ক্রসফায়ারে” মেরে ফেলা ও তার পরিবারের সদস্যদের জীবন বিপন্ন করার হুমকি দিয়েছিলেন।
আসামি তালিকায় তদন্তকারীরাও
নিরপেক্ষ তদন্তে দেখা যায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে তদন্তকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে। হামলাকারীদের সুবিধার্থে পুলিশ অনুষ্ঠানস্থলে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়নি। গ্রেনেড নিক্ষেপের পর তারা সমাবেশে লাঠিচার্জ করে। তদন্তকারীরা প্রমাণ হিসাবে অবিস্ফোরিত গ্রেনেডগুলো জব্দ করেননি।
মুফতি হান্নানকে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তকারীরা তাকে হামলার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। হান্নানকে গ্রেপ্তারের পর জজ মিয়ার গল্প তৈরি হয়।
পরবর্তীতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, পুলিশ, এনএসআই ও ডিজিএফআই-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়।
তারেক রহমান কি হামলায় জড়িত ছিলেন?
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড ও গুলি আনার পর জঙ্গিরা বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দুইবার দেখা করে।
২০০৪ সালের প্রথম দিকে ঢাকার বনানীতে হাওয়া ভবনে তারা তারেকের সাথে দেখা করেন। ২০০৪ সালের আগস্টে তারা তারেকের সাথে আবার দেখা করেন, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা, এনএসআই, ডিজিএফআই-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
তারেক তাদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়।
হুজিবি ও হান্নানের সম্পৃক্ততা
হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামী বাংলাদেশের জঙ্গিরা বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড ও বুলেট নিয়ে আসে।
সংগঠনের প্রধান মুফতি আব্দুল হান্নান ও তার সহযোগীরা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। মুফতি হান্নান ছিলেন আফগান যুদ্ধের একজন অভিজ্ঞ। দেশে শরীয়া আইন প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়ে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের সাথে যোগসাজশে তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যার জন্য বেশ কয়েকটি হামলা চালান, যারা দলটিকে ইসলামের বিরোধী বলে চিহ্নিত করে।
তদন্তকারীরা বলেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিজব-উল-মুজাহিদিন, তেহরিক-ই-জিহাদ-ই-ইসলামি - কাশ্মীরি মুজাহিদিনের একটি গ্রুপ, লস্কর-ই-তৈয়বার একটি মনোনীত সংগঠন এই হুজিবি। এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি ইসলামিক সন্ত্রাসী সংগঠন। যা পাকিস্তান থেকে পরিচালনা কর হয়।