রাজধানী ঢাকার শাহবাগ থানায় ছাত্রলীগের দুই কেন্দ্রীয় দুই নেতাকে মারধর ঘটনা এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে করে ক্ষণে-ক্ষণে বদলাচ্ছে প্রেক্ষাপট।
ছাত্রলীগ নেতাদের মারধরের ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তিন সরকারি কর্মকর্তা। তারা হলেন, পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হারুন-অর-রশিদ, এডিসি (ক্রাইম-১) সানজিদা আফরিন নিপা এবং তার স্বামী বিসিএস কর্মকর্তা আজিজুল হক মামুন। যিনি বর্তমানে রাষ্ট্রপতির এপিএস হিসেবে নিযুক্ত।
মারধরের ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত ডিএমপির এডিসি হারুন-অর-রশীদকে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয়ে যুক্ত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এডিসি হারুন প্রধান অভিযুক্ত হলেও পুলিশের বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে সেদিন এপিএস মামুনই প্রথম এডিসি হারুনের ওপর হামলা করেন। মঙ্গলবার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান হারুন অর রশীদ।
এরপর এডিসি সানজিদাও একই দাবি করেন। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই’কে তিনি জানান, তার স্বামীই প্রথম এডিসি হারুনের ওপর হামলা করেন। এবার একই দাবি করলেন এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত এডিসি হারুন।
বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) চ্যানেল আইযের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেন এপিএস মামুন প্রথম তাকে ঘুসি মারেন। প্রতিবাদ করলেও তার সঙ্গে থাকা লোকজনও হারুনকে মারধর করেন।
এডিসি হারুন বলেন, “গত শনিবার আমি আমার বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য তাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডা. কুন্তল কুমারের কাছে যাই। দুপুর দুইটার দিকে আমাদের এডিসি ক্রাইম-১ (সানজিদা) ফোন করে জানায় তার বুকে ব্যাথা। তিনি আমাকে বারডেম হাসপাতালে ডা. রশিদ স্যারের সিরিয়াল পাওয়া যায় কি-না সে ব্যাপারে বলেন। আমি তখন রমনা থানার ওসি আবু হোসেন সাহেবকে বলি সিরিয়াল ম্যানেজ করার ব্যাপারে। তিনি পরে আমাকে জানান যে, সন্ধ্যা ছয়টায় সিরিয়াল পাওয়া গেছে। আমি সেটা এডিসি ক্রাইম-১’কে জানায়। তিনি সন্ধ্যা ছয়টায় সেখানে (বারডেমে) যান।”
“পরবর্তীতে ডা. আব্দুর রশিদ স্যার বারডেমের কনফারেন্স রুমে বা এডমিনেস্ট্রেটিভ কাজের ব্যস্ততার কারণে সময় দিতে পারছিলেন না। কিন্তু রোগী (সানজিদা) সেখানে গিয়ে অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। তখন সে আমাকে ডাক্তারের ব্যস্ততা এবং তার অসুস্থ বোধ করার বিষয়টি জানায়। আমি তখন কাছাকাছি এলাকায় থাকায় তাকে বলি যে, আমি হাসপাতালে এসে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে দেখছি”, বলেন এডিসি হারুন।
তিনি সেখানে গিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেন উল্লেখ করে জানান, এরপর ডাক্তার সানজিদাকে দেখে তিনটি টেস্ট (ইসিজি, ইকো, ইটিটি) করতে দেন।
এডিসি হারুন বলেন, “যখন রোগী টেস্টের জন্য ইটিটি রুমে যায়, তখন আমি বাইরে ভিজিটরদের বাসার স্থানে অপেক্ষ করতে থাকি।”
এ সময় আজিজুল হক মামুন চার-পাঁচজনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে আসেন উল্লেখ করে এডিসি হারুন বলেন, “তিনি এসে রোগীর রুমে যান। রোগীকে (সানজিদা) দেখে বাইরে এসেই কোনো কথাবার্তা ছাড়াই আজিজুল হক মামুন আমার বাম চোখের ওপর একটা ঘুসি মারে। আমি তখন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। তাকে জিজ্ঞেস করি, ভাই আপনি হঠাৎ আমাকে কেন মারলেন? আপনি তো আমার গায়ে হাত তুলতে পারেন না। তখন তার সঙ্গে থাকা শিক্ষার্থীরাও আমার ওপর চড়াও হয়। এরপর তারা আমাকে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে ইটিটি রুমে নিয়ে যায়। সেখানেও তারা আমাকে মারধর করে। তখন আমি আত্মরক্ষার্থে শাহবাগ থানার ওসিকে কল করি। পুলিশ এসে সবাইকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়।”
আরও পুড়ন: হারুনকে নয়, স্বামীকেই দায়ী করলেন এডিসি সানজিদা
এর আগে, গত শনিবার রাতে ছাত্রলীগের দুই কেন্দ্রীয় নেতাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে ডিএমপির রমনা জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) হারুনের বিরুদ্ধে।
আহতরা হলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদুল্লাহ হলের সাধারণ সম্পাদক শরীফ আহমেদ মুনিম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফজলুল হক হলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন নাঈম।
আহতদের সহপাঠী ও ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, এডিসি হারুন শনিবার রাতে আরেক নারী পুলিশ কর্মকর্তা সানজিদার সঙ্গে বারডেম হাসপাতালে ছিলেন। সানজিদার স্বামী বিসিএস কর্মকর্তা আজিজুল হক মামুন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। এ সময় তার সঙ্গে এডিসি হারুনের বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সেটি হাতাহাতিতে রূপ নেয়। এরই জেরে সঙ্গে থাকা দুই ছাত্রলীগ নেতাকে থানায় নিয়ে বেদম মারপিট করা হয়।
এরপর রবিবার প্রথমে এডিসি হারুনতে ডিএমপির রমনা বিভাগ থেকে প্রত্যাহার করে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে সংযুক্ত করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর তাকে কক্সবাজারের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) বদলি করা হয়। এরপর সোমবার তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মঙ্গলবার তাকে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয়ে যুক্ত করা হয়।