সাইবার নিরাপত্তা আইন

আইনমন্ত্রী: আমলযোগ্য অপরাধ ছাড়া বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের অধিকার নেই

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের আপত্তির ধারাগুলোর আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

তিনি বলেছেন, “সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে মাত্র চারটি আমলযোগ্য অপরাধ (কগনিজিবল অফেন্স) আছে। আর সব অ-আমলযোগ্য অপরাধ (নন-কগনিজিবল অফেন্স)। আমলযোগ্য অপরাধ ছাড়া বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করার অধিকার কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই। যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে, এটা সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের অপব্যাখ্যা।”

শুক্রবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশেষ বর্ধিত সভায় যোগদানের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।

আইনমন্ত্রী বলেন, “সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে টেকনিক্যাল অপরাধ, হ্যাকিং ও কম্পিউটারের ভেতরে ঢুকে যদি কেউ কোনো কিছু নষ্ট করে, সে জন্য ১৪ বছরের সাজার বিধান রয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে যেসব ধারা নিয়ে সাংবাদিক মহলের আপত্তি ছিল, সেসব ধারা আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে। বিনা পরোয়ানায় যে গ্রেপ্তারের কথা বলা হচ্ছে, সেটার কিন্তু শর্ত আছে। একটি হচ্ছে, এটা আমলযোগ্য অপরাধ হতে হবে।”

দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রদ করে সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইনের উদ্যোগ নেয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উঠার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। গত বুধবার সংসদে সাইবার নিরাপত্তা বিল পাস হয়।

সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বিলটির বিরোধিতা করেন। তারা বলেন, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের স্বীকৃতি সংবিধানেই দেওয়া হয়েছে। অথচ এই বিলের বিভিন্ন ধারায় সংবিধান স্বীকৃত এসব অধিকার খর্ব করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। বিরোধিতার পরেও বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

আইনটির খসড়া প্রকাশের পর থেকেই মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন বলে আসছে, সাইবার নিরাপত্তা আইনও কার্যত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মূল বিষয়বস্তু বহাল রাখা হচ্ছে।

আইনের অপব্যবহারের শঙ্কা

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মতোই এই আইনের অপব্যবহারের শঙ্কা ব্যক্ত করে তারা বলছেন, প্রস্তাবিত আইনে কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানো ও জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানো হলেও অপরাধের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ থেকেই যাবে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের পর্যালোচনায় বলেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা ২৫ (মিথ্যা বা আপত্তিকর তথ্য প্রকাশ), ধারা ২৯ (মানহানিকর তথ্য প্রকাশ) এবং ধারা ৩১ (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর শাস্তি) সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় অবিকৃত রয়েছে। ২৫ ধারায় “রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন” সংক্রান্ত কোনো ব্যাখ্যা না থাকায় এর অপব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে।

মিথ্যা মামলা করলে শাস্তি

পাস হওয়া বিলে মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ দায়েরের অপরাধ ও দণ্ড নিয়ে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কারো ক্ষতিসাধনের জন্য এই আইনের কোনো ধারায় মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেন বা করান, তাহলে তা হবে একটি অপরাধ। এই অপরাধে মামলা বা অভিযোগকারী ব্যক্তি এবং যিনি অভিযোগ করেছেন- ওই ব্যক্তি মূল অপরাধটির জন্য যে দণ্ড নির্ধারিত রয়েছে সে দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি এই আইনের একাধিক ধারায় কোনো মামলা বা অভিযোগ করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধারায় বর্ণিত অপরাধগুলোর মধ্যে মূল অপরাধের জন্য যেটার দণ্ডের পরিমাণ বেশি হয় সেটাই দণ্ডের পরিমাণ হিসাবে নির্ধারণ করা যাবে।

বিলে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল মিথ্যা মামলা ও অভিযোগ দায়েরের অপরাধে অভিযোগ গ্রহণ ও মামলার বিচার করতে পারবে।

বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা

বিলের ৪২ ধারায় বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। এই ধারায় সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের কর্মকর্তার পরিবর্তন এনে পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ধারাটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও ছিল।

তথ্য-উপাত্ত অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষমতা

বিলের ৮ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যম থেকে তথ্য-উপাত্ত অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর “তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ সাপেক্ষে, বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে” ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনও তথ্য-উপাত্ত দেশের বা দেশের কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করে, বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য মহাপরিচালকের মধ্যমে বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে।

বিরোধী সংসদ সদস্যরা মনে করেন, নতুন বোতলে পুরোনো মদ

সংসদে বিলটি উপস্থাপন করা হলে আলোচনায় অংশ নিয়ে গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, “বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা এই আইনে যুক্ত করা হয়েছে। এটা অনেকটা নতুন বোতলে পুরোনো মদ রাখার মতোই অবস্থা। আইনটি নতুন করে হচ্ছে কিন্তু স্বস্তি ফিরে আসছে না। যেভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছিল অনেকটা হুবহু সেভাবেই এই আইন করা হচ্ছে। জাতিসংঘ, সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিকদের যেসব আপত্তি ছিল উদ্বেগের বিষয় ছিল সেগুলো রয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “৯টি ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে সংশোধনের দাবি জানিয়েছিল সম্পাদক পরিষদ। এখন প্রস্তাবিত সাইবার আইনে ৭টি ধারায় সাজা ও জামিনের বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়েছে। কিন্তু অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়নি। আগের মতোই রয়ে গেছে। তার দুটি ধারায় কোনো পরিবর্তনই আনা হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর থেকে দুটি ধারা বাতিলের আহ্বান করেছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে তা বাতিল না করে সাজা ও জামিনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে।”