ফরিদপুরে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

দুর্গাপূজার বাকি আর মাত্র কয়েক দিন। ‍শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ফরিদপুরের পূজা মণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও কোথাও প্রতিমার গড়া শেষ, চলছে রঙের কাজ।

ফরিদপুরে এ বছর ৮৩৪টি মণ্ডপে পালিত হবে দুর্গা উৎসব। ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষে থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শারদীয় দুর্গাপূজাকে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মন্দির কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে ফরিদপুর জেলা প্রশাসন ও পুলিশ।

সরেজমিনে দেখা যায়, আলিপুর সার্বজনীন পূজা মণ্ডপে প্রতিমায় রঙের কাজ চলছে। তুলির নিপুণ ছোঁয়ায় দেবীকে রাঙিয়ে তুলছেন কারিগর সজল কুমার পাল।

এ বছর তিনি মোট ১০টি প্রতিমার কাজ করছেন। ইতোমধ্যে চারটি প্রতিমার কাজ শেষ হয়েছে। পাল সম্প্রদায়ের কারিগররা শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত।

অন্যদিকে শারদীয়া দুর্গাপূজা উপলক্ষে শহরের কয়েকটি মন্দিরে আলোকসজ্জার কাজ শুরু হয়েছে। মুজিব সড়কের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সার্বজনীন মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, মাটি দিয়ে চলছে শেষ প্রলেপের কাজ। এরপরই রঙের আঁচড়ে রাঙিয়ে তোলা হবে দেবীকে। ১৯ অক্টোবরের মধ্যে বাকি কাজগুলো সম্পন্ন হয়ে যাবে বলে আশা আয়োজক কমিটির।

চলছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি/ঢাকা ট্রিবিউন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আলফাডাঙ্গা উপজেলার পৌর সদরের শ্রী শ্রী হরি মন্দিরে দুর্গাপূজার এবারের আয়োজন একটু ব্যতিক্রমধর্মী। পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে এখানে সত্য, দ্বাপর, ত্রেতা ও কলি এই চারকালে দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনে ভগবানের অংশ হিসেবে যে চারজন অবতার আবির্ভূত হয়েছেন (শ্রীহরি, শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীগৌরাঙ্গ) তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে ৫২টি খণ্ডে। মণ্ডপজুড়ে আলাদা আলাদা কাহিনীর ভিত্তিতে প্রতিমা সাজিয়ে পূজা উদযাপন করা হবে।

ভারত থেকে প্রতিমা গড়তে ফরিদপুরে এসেছেন শিল্পী অনিল পাল। ছয় সহযোগীকে নিয়ে প্রতিমাগুলো তৈরি করেছেন তিনি। এগুলো তৈরিতে তাদের সময় লেগেছে প্রায় তিন মাস। ২০২২ সালেও তিনি এখানে ১০১টি প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। তবে এবার তিনি গত বছরের চেয়েও ১০০টি প্রতিমা বেশি তৈরি করছেন।

প্রতিমা শিল্পী অনিল পাল ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “গত বছর ১০১টি প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। প্রতিমাগুলো দর্শনার্থী ও ভক্তদের পছন্দ হয় এবং এই এলাকায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে পূজা উদযাপিত হয়। এবার ছয়জন সহযোগী নিয়ে তিন মাস ধরে কাজ করেছি। গতবারের চেয়ে এবার ১০০ প্রতিমা বেশি। মোট পাঁচ লাখ টাকা চুক্তিতে এবার ২০১টি প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। আশা করি গতবারের চেয়েও এবার বেশি ভালো হবে।”

এ বিষয়ে শ্রী শ্রী হরি মন্দির ও পূজা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার বিশ্বাস ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “দেবী দুর্গাসহ ২০১টি প্রতিমা স্থাপনের মাধ্যমে গতবারের চেয়েও এবার দেশের অন্যতম বড় পরিসরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। গত বছর লাখো মানুষের আগমন ঘটেছিল। আশা করছি এবারও পূজা দেখতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে লাখ লাখ দর্শনার্থীরা আসবেন। আমাদের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে।”

পূজা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিমা দেখতে ভিড় করছেন মানুষ/ঢাকা ট্রিবিউন

তিনি আরও বলেন, “গত বছর প্রায় লাখ দশেক টাকার মতো খরচ হয়েছিল। এবার বাজেট বাড়ানো হয়েছে। এবার ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো খরচ হবে। মন্দির কমিটি ৫১ সদস্য বিশিষ্ট। সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন মানুষের দান-অনুদানই এই টাকার উৎস। ২০ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ পূজা ও প্রতিমার প্রদর্শনী চলবে।”

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি সুকেশ সাহা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “জেলায় এ বছর ৮৩৪টি মণ্ডপে দুর্গা উৎসব পালন করা হবে। আশা করি প্রতি বছরের মতো এবারও সাড়ম্বরে দুর্গাপূজা উদযাপন করব। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতারাও মণ্ডপে মণ্ডপে অতিথি হবেন। আমাদের খোঁজ খবর নেবেন।”

তিনি আরও বলেন, “রং তুলির আঁচড়ে এখন চলছে মণ্ডপে দেবীকে সাজানোর কাজ। অনেক মণ্ডপ তৈরি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, সেগুলোকে ঢেকে রাখা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ উৎসব পালনে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ফরিদপুরের আশেপাশের জেলা এবং শহর থেকে অসংখ্য ভক্ত এ বছর পূজা উদযাপন করতে আসবেন।”

ফরিদপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ড. যশোদা জীবন দেবনাথ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ফরিদপুরে আসন্ন দুর্গাপূজায় প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। আশা করি সুন্দর, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হবে।”

পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রতিটি পূজা মণ্ডপের কমিটিতে সব ধর্মের মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ধর্মীয় সঙ্গীতের বাইরে অকারণে উচ্চস্বরে মাইক ও সাউন্ডবক্স বাজানোর ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে।‌ এছাড়া পুজোর আগে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। মাদক সেবন করে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”

এ বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা চাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ এই উৎসবটি নির্বিঘ্নে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হোক। এর জন্য যা যা প্রয়োজন জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “এবারের দুর্গা পূজায় প্রত্যেক মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। প্রত্যেকটি মণ্ডপের জন্য নিরাপত্তা বাহিনী গঠন ও স্বেচ্ছাসেবক কর্মী নিয়োগ করতে হবে। এছাড়াও পূজা চলাকালীন ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হবে।”