পড়াশোনার দৃপ্ত সংকল্প। এদিকে অভাবের সংসার। তাই চায়ের দোকান থেকে রোজগারের প্রচেষ্টা। স্মৃতি আক্তারের সংগ্রামটা এমনই। ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ফাইভ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
রবিবার (২৬ নভেম্বর) এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ফল ঘোষণা করা হয়।
স্মৃতি আক্তারের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক সংকল্পের গল্প। এসএসসিতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। তাই কঠিন সংকল্প করে এবার তিনি ছিনিয়ে এনেছেন আরাধ্য সাফল্য।
স্মৃতির বাবা মো. হারুন শেখ একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। স্মৃতিরা দুই বোন এক ভাই। বড় বোন মনিকা আক্তারও দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে ফরিদপুরের সারদা সুন্দরী কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করেছেন।
স্থানীয় ময়না বাজার সংলগ্ন বাড়ির পাশেই ছোট একটি মুদি দোকান তাদের। আয় বাড়াতে সেখানে চা বিক্রি শুরু করেন দুই বোন।
স্মৃতির মা আসমা আক্তার ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে তার শ্বশুর বাড়ির পাশে মুদির দোকান শুরু করেন। শ্বশুরের মৃত্যুর পর তার স্বামী হারুন শেখ দোকানটি চালাতেন। ছোটবেলা থেকে তাকে সহায়তা করত মেয়েরা। তবে আয় খুব বেশি না হওয়ায় দোকান ছেড়ে হারুন তালগাছ বেচাকেনার ব্যবসা শুরু করেন।
তবে দুই মেয়ে দোকানটি বন্ধ হতে দেয়নি। উপরন্তু দোকানের একপাশে তারা গড়ে তোলে ছোট একটি চায়ের দোকান।
স্মৃতি জানান, কিছু বাড়তি আয় এবং পড়াশোনার খরচ যোগাতে তারা দুই বোন পারিবারিক মুদি দোকানে চা বিক্রির চিন্তা করেন। প্রথমদিকে একটু সমস্যা হলেও এখন তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।
তিনি বলেন, “সারাদিনে চা বিক্রির পাশাপাশি সময় পেলেই পড়াশোনা করি। পাশাপাশি রাতে যেটুকু সময় পাই কাজে লাগাই। এভাবেই আমরা দুই বোন পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ গড়ার পথ বেছে নিয়েছি। তবে অর্থের অভাবে ইচ্ছে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারি না।”
স্মৃতির ইচ্ছে ছিল চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু মানবিক বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ নেই। তাই উচ্চশিক্ষা নিয়ে মানুষের সেবা করা যায় এমন কোনো পেশায় নিযুক্ত হতে ইচ্ছুক তিনি।
স্মৃতি-মনিকার বাবা হারুন শেখ ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “মেয়েদের এ সাফল্যে আমরা খুবই আনন্দিত। এর আগে আমার আরেক মেয়ে অনার্স পাশ করায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। তাদের পড়াশোনার সাফল্যে এই টাকা অনেক কাজে লেগেছে।”
হারুনের মেয়েদের উচ্চশিক্ষা লাভে বড় বাধা আর্থিক সংকট। এই বাধা না থাকলে মেয়েরা আরও ভালো ফলাফল করতে পারত বলে বিশ্বাস এই বাবার।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) মেম্বার মো. বাচ্চু শেখ বলেন, “মনিকা ও স্মৃতির এই সাফল্যের খবরে আমি আনন্দিত। পুরো গ্রামের মানুষই আনন্দিত। তারা ভবিষ্যতে পড়াশোনা করে আরও বড় হোক এই কামনাই করি।”