গাছ-পাহাড় না কাটার শর্তে মৌলভীবাজারে হচ্ছে সাফারি পার্ক

১৯৯৯ সালে কক্সবাজারের চকোরিয়ায় গড়ে তোলা হয় দেশের প্রথম সাফারি পার্ক। ডুলাহাজরা নামে পরিচিত পার্কটির বর্তমান নাম “ডুলাহাজরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সাফারি পার্ক”। এরপর ২০১১ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরে দ্বিতীয় সাফারি পার্ক “গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক” গড়ে তোলা হয়। এবার তৃতীয় সাফারি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ৩৬৪ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে মৌলভীবাজারের জুড়ীতে  “মৌলভীবাজার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক” নামের এই পার্কটি গড়ে তোলা হবে।

২০২৩ সালের নভেম্বরে একনেকের সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৫,৬৩১ একর এলাকায় সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়া এবং প্রকল্পভুক্ত জমি থেকে কোনো গাছ ও পাহাড় না কাটার শর্তে গড়ে তোলা হবে এই পার্কটি। আগামী বছর শুরু হওয়া এই পার্কটি ৪ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

বন অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ; দেশের বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি; চিত্তবিনোদন, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি; বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী ফলজ, ফডার, ও মিশ্র প্রজাতির বাগান তৈরি করার উদ্দেশ্যে এই পার্কটি গড়ে তোলা হবে।

বানর, মায়া হরিণ, বেজি, বনরুই, ছোট খাটাশ, বন বিড়াল, খরগোশ, শিয়াল, খেঁকশিয়াল ও অজগরসহ বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি ও সংরক্ষণ করা হবে এই পার্কে। এছাড়া বিরল ও বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন বাঘ, চিতাবাঘ, সম্বর হরিণ, মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, প্যারা হরিণ এবং অন্যান্য তৃণভোজী বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা হবে এতে।

গণ্ডার, এশীয় হাতি, পাখি পরিযান, জলচর পাখি, বনছাগল, সিংহ, স্লথ ভালুক, এশীয় কালো ভাল্লুক, স্বাদুপানির কুমির, লোনা পানির কুমির, নীলগাই, জলহস্তী ইত্যাদি বিপন্ন ও বিলুপ্ত বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা; আহত ও উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণীর চিকিৎসায় সেবাশ্রম ও হাসপাতাল স্থাপন করা; সারাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করা।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশবান্ধব বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে। বায়োডাইভার্সিটি পার্ক স্থাপন করা হবে। পার্কের ভেতরে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বন্যপ্রাণী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। ২০০ হেক্টর এলাকায় ফল ও পশু খাদ্যের বাগান সৃষ্টি করা হবে। পার্কের ভেতরে ২৫ হেক্টর এলাকায় চারণভূমি, বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ২৫ হাজার চারা রোপণ, শোভা বর্ধনকারী স্ট্রিপ বাগান সৃষ্টি, সীমানা প্রাচীর ও অভ্যন্তরীণ অস্থায়ী বেষ্টনী, দুটি আরসিসি বাঁধ, রিটেইনিং ওয়াল, আরসিসি রোড, ওয়াকওয়ে, জেনারেটরসহ একটি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে।

এছাড়া সাইনেজ (বিল বোর্ড, ডিস্প্লে ম্যাপ, সাইনবোর্ড ইত্যাদি) এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সিসিটিভিসহ সিকিউরিটি সিস্টেম, আইটি ব্যবস্থা, ট্রান্সটাইল গেট সমাধানসহ এক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেম, সাউন্ড সিস্টেম ও ডিজিটাল টিকেটিং ব্যবস্থা  ইত্যাদিও থাকবে প্রকল্প এলাকায়।

প্রকল্প প্রস্তাবে পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সংকটে থাকা, বিপন্ন বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে। মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার জুড়ী রেঞ্জের আওতাধীন লাঠিটিলা বিটের চিরসবুজ এ বনাঞ্চলকে ১৯২০ সালে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়। এই অঞ্চলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ও অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়া ও প্রকল্পভুক্ত জমিতে কোনো গাছ ও পাহাড় না কেটে সাফারি পার্ক গড়ে তোলার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।