শরীফার গল্প বিতর্ক: কে সঠিক আর কে ভুল?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মুহূর্তে অন্যতম আলোচিত বিষয় “শরীফার গল্প”। ৭ম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের এই অধ্যায়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সমকামিতা এবং ট্রান্সজেন্ডারের বিরোধিতা করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ৭ম শ্রেণির ওই বইয়ের পাতা ছেঁড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে ওই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

অনেকে বলছেন, হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য পাঠ্যবইয়ে এই অংশটি যুক্ত করা হলেও হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডার বিষয়ে সঠিক সংজ্ঞা না থাকায় বিতর্কের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

শারমিন সুলতানা কানিজ নামে একজন চিকিৎসক ও মা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি আমার সন্তানকে পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে এমন ভুল শিক্ষা দিতে পারি না। এটা খুবই ভুল পদক্ষেপ। এই শিক্ষক এমন বক্তব্য না দিলে আমরা কেউ জানতাম না। এটা কীভাবে বলা যায় যে ট্রান্সজেন্ডার এবং হিজড়া একই বিষয়?”

তিনি ৭ম শ্রেণির মতো পর্যায়ে পাঠ্যবইয়ে এমন বিষয়ের অন্তর্ভুক্তির বিপক্ষে বলেও মত দেন।

যদিও অনেক অভিভাবকই এই ধরনের অধ্যায়ের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে তাদেরও দাবি, ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়া বিষয়টিকে এক না করে সুপ্ষ্ট ব্যাখা দেওয়ার।

ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার নিশ্চিতে কাজ করে এমন একটি সংস্থা “সম্পর্কের নয়া সেতু (এসএনএস)” সংস্থার সভাপতি জয়া সিকদার বলেন, “এই অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান ত্রুটি হলো‘হিজড়া’ শব্দটি ব্যবহার করা। হিজড়া আর ট্রান্সজেন্ডার এক বিষয় নয়। আপনি যখন হিজড়া শব্দটি চিন্তা করেন, আপনি ধরে নেন, তারা এমন একজন ব্যক্তি যারা বায়োলজিক্যাল কারণে পুরুষ বা নারী কোনোটিই নন।”

তিনি আরও বলেন, “বাস্তবে হিজড়া শব্দটি দ্বারা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বোঝায়। তাদের মধ্যে আন্তঃলিঙ্গ বৈচিত্র্য, জননাঙ্গ অক্ষম পুরুষ এবং ট্রান্সজেন্ডার নারী সবাই অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন। এই গোষ্ঠীর লোকেরা একটি সম্প্রদায় বা পরিবার হিসেবে বসবাস করেন। তাদের একজন গুরু মা থাকেন। গোষ্ঠীর সব সদস্য গুরু মা’র নির্দেশ মেনে চলেন। প্রকৃতপক্ষে, হিজড়া আসলে কোনো লিঙ্গ নয়, হিজড়া মূলত একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়।”

ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে হিজড়া সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য, পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে তাদের সম্প্রদায়, জীবনধারা এবং চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এমন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তবে পাঠ্যপুস্তকে শরীফ ও শরীফার গল্পে তাদের সম্প্রদায় সম্পর্কিত সঠিক তথ্য উপস্থাপিত হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।

এ বিষয়য়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, “শরীফার গল্প অধ্যায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে এবং বিষয়টি উপস্থাপনে কোনো বিভ্রান্তি বা বিতর্ক থাকলে তা সংশোধন করা হবে।”

এদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করায় প্রতিবাদ জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী জানান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে বিস্তারিত জানার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় বইয়ের পাতা ছেঁড়ার ভিডিওটি দেখেছেন উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, "একটি পক্ষ সবসময় ধর্মীয় ইস্যু তুলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে।"

“শরীফার গল্প” অধ্যায়টি পর্যালোচনা করতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আব্দুর রশীদকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নর মুফতি মাওলানা কফিল উদ্দীন সরকার, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) পরিচালক অধ্যাপক আবদুল হালিম এবং ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ।