‘যান্ত্রিক জটিলতায়’ ভরসার মেট্রোরেল আস্থার সংকটে

যানজটের শহর ঢাকায় আশির্বাদ হয়ে এসেছে মেট্রোরেল। গত এক বছরে নগরবাসীর কাছে ভরসা স্থল হয়ে উঠেছে আধুনিক এ যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে ইদানীং হুটহাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চলাচলের দ্রুততম এই বাহনটি। কখনো যান্ত্রিক জটিলতা, কখনো ঘুড়ি, কখনও ফানুস, কখনও বা বিদ্যুৎ- নানা কারণে থেমে যাচ্ছে মেট্রোরেলের চাকা। আবার যাত্রীদের এমআরটি পাসও নষ্ট হচ্ছে হুটহাট। আর তাতেই ভরসার মেট্রোরেল মাঝে মাঝেই হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তার কারণ। এতে বিপাকে পড়ছেন যাত্রীরা।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু মেট্রোরেলে। প্রথম দিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে চললেও গত বছরের নভেম্বর থেকে পুরো দমে শুরু হয়েছে মেট্রোরেলের কার্যক্রম। দৈনিক ১৩ ঘণ্টার বেশি সময় চলাচল করছে আধুনিক এই বাহনটি। কম সময়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার কারণে মেট্রোরেল জয় করেছে নগরবাসীর আস্থা। তবে সাম্প্রতিক জটিলতাগুলো ভাবাচ্ছে জরুরি সময়ে হঠাৎ আটকে পড়া নিয়ে।

পূর্বঘোষণা ছাড়াই চলতে চলতে হঠাৎ বন্ধ হচ্ছে মেট্রোরেল। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নানা সময়ে নানা কারণ দেখাচ্ছে। কখনও অল্প সময়ে ঠিক হয়ে যাবার কথা বললেও ঘণ্টাখানেকও বিলম্ব হচ্ছে। ফলে যাত্রীরা যে সময়ের পরিকল্পনা নিয়ে মেট্রোরেল এসেছিলেন বা কাজের পরিকল্পনা করেছিলেন, তা অনিশ্চয়তার কবলে পড়ছে।

শামীম আহমেদ নামের মিরপুরের এক যাত্রী বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এ নিয়ে। মতিঝিলের একটি বেসরকার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর অনেকের মতোই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন তিনি। তবে ৬ মাসে অন্তত ৭ দিন তিনি যান্ত্রিক জটিলতায় পড়েছেন। কখনো অপেক্ষার পর মেট্রোরেলে চড়েই বিলম্বে অফিসে পৌঁছেছেন। আবার কখনো বা অন্য বাহনে গিয়েছেন।   

তাসলিমা আলম চাকরি করেন কাওরান বাজরের একটি প্রতিষ্ঠানে। গত দুই মাস ধরে তিনি নিয়মিত মেট্রোরেলেই যাতায়াত করেন। তার দাবি, গত দুই মাসে তিন দিন অফিসের উদ্দেশে বের হয়ে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেননি তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মেট্রোরেল আমাদের আস্থার প্রতীক। সঠিক সময়ে নিরাপদে পৌঁছাতে পারব বলেই মেট্রোতে যাতায়াত করি। এখন সেটিও সময়সূচি মেনে চলে না। হঠাৎ করেই যান্ত্রিক জটিলতায় বিলম্ব হচ্ছে। আবার ঘুড়ি বা ফানুসের কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।'”

মেট্রোরেল ঢাকার যাতায়াতে এনেছে নতুন মাত্রা। বিপুলসংখ্যক মানুষ এই গণপরিবহনে যাতায়াত করছেন নিয়মিত (৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ফার্মগেট স্টেশন থেকে তোলা ছবি)/আহাদুল করিম খান/ঢাকা ট্রিবিউন

মেট্রোরেলের আরেক নিয়মিত যাত্রী চৈতন্য চন্দ্র হালদার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “বৃহস্পতিবার আমি সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে মতিঝিলের দিকে যাওয়ার জন্য মিরপুর-১০ স্টেশনে ছিলাম। ট্রেন এসেছিল ৮টা ১৩ মিনিটে। ততক্ষণে প্ল্যাটফর্মে অনেক যাত্রী জড়ো হয়ে গিয়েছিলেন।”

এর আগেও এরকম হয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি গত এক মাসে এরকম তিন বার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। হয় সময়সূচিতে জটিলতা হচ্ছে, অথবা বাহনই আটকে যাচ্ছে। ট্রেন বিলম্বে আসার কারণে অনেক এসএসসি পরীক্ষার্থীকেও প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।”

সবশেষ গত শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি)  সকালেও জটিলতায় পড়ে মেট্রোরেল। দরজা বন্ধ না হওয়ার জটিলতায় প্রায় দেড় ঘণ্টা বন্ধ থাকে চলাচল।

জটিলতা এমআরটি পাসেও

মেট্রোরেলের সময়সূচির জটিলতার পাশাপাশি এমআরটি পাসের জটিলতাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ বলছেন, “তিন দিন ধরে ঘুরছি, সার্ভার বন্ধ থাকায় কোনো সমাধান পাচ্ছি না।” কেউ বলছেন, “এমআরটি পাসে তো হয়রানি আরও বেড়ে গেছে।” আবার কেউ কেউ পুরো সিস্টেমকেউ দোষ দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট উৎপাদন প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির অধীনে আনতে বলছেন। আবার কেউ বলছেন, এমআরটি পাসে ম্যাগনেটিক রিবন আছে। কার্ডটি যত্ন করে রাখতে হবে।

সম্প্রতি ফেসবুকে মেট্রোরেলের একটি কমিউনিটি গ্রুপে তানজিনা আমান তানজুম ও জিন্নুন নাহার নামের দুজন মেট্রো যাত্রী দ্রুত এমআরটি পাস ড্যামেজ হওয়া নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। তারা সার্ভার সমস্যার কারণে হয়রানির ভোগান্তিতে পড়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।

তানজিনা আমান লিখেছেন, “সুস্থ কার্ড হুটহাট ড্যামেজ হয়ে যাচ্ছে! কার্ড নিয়ে গেলেই বলে এর কাছে যান, ওর কাছে যান! এমআরটি পাসে হয়রানি তো আরও বেড়ে গেল! তার ওপর কার্ডে বেশি রিচার্জ করে নিলাম তখন বলে ড্যামেজ।”

জিন্নুন নাহার লিখেছেন, “২০২২ সালে দিল্লিতে ছিলাম। এক বছরে কখনো কার্ড ড্যামেজ, সার্ভার নাই এসব শোনা লাগেনি। তখনের চেয়ে প্রযুক্তি এখন আরও এগিয়েছে! আরও অনেক ফার্স্ট কাজ করার কথা।”

মেট্রোরেলে যাত্রীদের ভিড়(৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ফার্মগেট স্টেশন থেকে তোলা ছবি)/আহাদুল করিম খান/ঢাকা ট্রিবিউন

প্রতীতি চৌধুরী নামের একজন লিখেছেন, “কার্ড দেখতে ঠিকঠাক হলেও ভেতরে চিপ আছে সেটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে ড্যামেজ। এক্ষেত্রে আপনার দোষ নেই। যিনি কাউন্টারে দায়িত্বরত তাদেরও দোষ নেই। কারণ সার্ভারে সমস্যা থাকলে আপনার তথ্য শো করবে না, ফলে এটা রেজিস্ট্রেশন করে পুনরায় আপনাকে নতুন কার্ড দেওয়ার সুযোগ নেই।”

কর্মকর্তারা যা বলছেন

মেট্রোরেলের এসব জটিলতা নিয়ে শনিবার ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের তিনজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) নাজমুল ইসলাম ভূইয়া জানান, বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চান না। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের কথা বলার পরামর্শ দেন।

তার দাবি, এ ধরনের বিষয়ে তার কথা বলার অনুমতি তার নেই। বিষয়টি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের তাই পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

তবে মোবাইল ফোনে চেষ্টা করা হলেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিকির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, ডিএমটিসিএলের আরেকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তিনি বলেন, ‘‘মেট্রোরেলে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থা বন্ধ করে এর কারণ খুঁজতে হয়। এরপর ত্রুটি চিহ্নিত করে সমাধান করার পর পুনরায় চালু করলেই মেট্রোরেল চলা শুরু করে না। পুরো ব্যবস্থাটি পুনরায় চালু হতে সময় লাগে।”